চারদিকে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রচার, তবু মানুষ হতাশায় ভোগে কেন
আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি, যখন মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাবিষয়ক নানা কার্যক্রম অহরহ চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বিভিন্ন সভা, সেমিনার, সেশন হচ্ছে। এগুলোর আয়োজন করছে বিভিন্ন সংগঠন। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করলেই অসংখ্য রিলস, ভিডিও, পডকাস্ট সামনে আসে; যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা পরামর্শ পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন জার্নাল ও সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ক আর্টিকেল রয়েছে।
এত কিছু থাকার ফলে এই যুগে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় সবারই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার কথা। কিন্তু অনেকেই তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খারাপ লাগার কথা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ জীবন নিয়ে হতাশার কথা ব্যক্ত করেন। মানুষ নিজেকে আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, বেশি হতাশ, বেশি আত্মকেন্দ্রিক আর জীবনের দিশা নিয়ে বেশি বিভ্রান্ত বলে মনে করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটা বেশি। অন্যান্য বয়সী মানুষের মধ্যেও কম–বেশি হতাশা কাজ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এত বেশি সচেতনতা আদৌ কাজে দিচ্ছে নাকি উল্টো প্রভাব ফেলছে? অথবা অন্য কোনো কারণ!
যখন ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে থেরাপিউটিক সংলাপ শুরু করি, ওর ভেতরের ছোট্ট কণ্ঠটি, যেটা ও আগে কখনো শোনেনি, সেই কণ্ঠের প্রতি তখন সচেতন হওয়ার জন্য সাহস পায়, তখন ওর চোখে আশার আলো ফুটে ওঠে।
তবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচুর সচেতনতা বেড়েছে বলে মানতে নারাজ সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক মাহমুদা মুহসিনা। তিনি বলেন, ‘যেই পরিমাণে সচেতনতা দরকার, এখনো আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। তবে বলতে পারি, আগের তুলনায় এখন অনেকটা বেড়েছে। ২১ বছরের থেরাপিউটিক যাত্রায় শিখেছি, এটা শুধুই বাহ্যিক তথ্যের অভাব নয়, বরং আমাদের অন্তরাত্মার গভীর বিচ্ছিন্নতা এবং নিজের সঙ্গে অসততা। ঠিক এ জায়গাতেই সচেতনতা এখনো বাড়েনি।’ এ নিয়ে একটি উদাহরণও দেন তিনি।
মাহমুদা মুহসিনা বলেন, ‘একবার একজন তরুণী ক্লায়েন্ট এসেছিল, যে দীর্ঘদিন মনোরোগজনিত চাপ ও অপ্রকাশিত ব্যথায় ক্লিষ্ট ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর তথ্য থাকলেও ওর হৃদয় শান্ত হতে পারছিল না। ও বলেছিল, “আমি জানি, কিন্তু আমার মন শান্ত হয় না।” যখন ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে থেরাপিউটিক সংলাপ শুরু করি, ওর ভেতরের ছোট্ট কণ্ঠটি, যেটা ও আগে কখনো শোনেনি, সেই কণ্ঠের প্রতি তখন সচেতন হওয়ার জন্য সাহস পায়, তখন ওর চোখে আশার আলো ফুটে ওঠে।’
আজকাল অনেকে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট দেখে নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ বিচার করেন। যাঁরা এসব পরামর্শ দেন তাঁদের কেউ কেউ নিজের চিন্তায় ভুল খুঁজতে, আচরণে ভুল খুঁজতে বলে থাকেন। আবার কেউ কেউ নিজের ভেতরের মানুষটির কথাকে গুরুত্ব দিতে বলেন। দুই ক্ষেত্রেই মনোযোগ আটকে থাকে নিজের মধ্যে। এ বিষয়ে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল মার্সটন বলেন, ‘আত্মসচেতনতা দরকারি হলেও, অতিরিক্ত আত্মপর্যবেক্ষণ মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ায়। লক্ষ্যহীন সতর্কতা শান্তি নয়, বরং অস্থিরতা তৈরি করে।’
ড্যানিয়েল মার্সটনের মতে, প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে দেখা যায় সুস্থতা আসে অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ থেকে নয়, বরং অর্থপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকা থেকে। প্রাণীরা আলাদা করে অনুভূতি সামলে ভালো থাকে না। তারা ভালো থাকে তখনই, যখন তাদের আচরণ জীবনের প্রয়োজনীয় লক্ষ্যগুলোর দিকে পরিচালিত হয়। যখন কোনো জীবের দিকনির্দেশনা থাকে না, অর্থপূর্ণ কাজ থাকে না বা নিজের পরিবেশে প্রভাব রাখার সুযোগ থাকে না, তখনই কষ্ট তৈরি হয়। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়।
ভাষা ও চিন্তার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে অনেক মানুষ মানসিকভাবে খুব ব্যস্ত, কিন্তু আচরণে স্থবির। তারা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় পারদর্শী, কিন্তু জীবনে কী করবে, সে বিষয়ে অনিশ্চিত। অনুভূতির কথা তারা জানে, কিন্তু সেই অনুভূতি তাদের কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা জানে না। এর ফলে মানুষ মানসিকভাবে সচেতন হলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে মানসিক স্বাস্থ্যের এ বিষয়গুলো খুব কমই আলোচিত হয় বলে মনে করেন ড্যানিয়েল মার্সটন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় অনুভূতির স্বীকৃতি, স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া, আর উপসর্গ মোকাবিলার ওপর। উদ্দেশ্য, দায়িত্ব, মূল্যবোধ আর জীবনের প্রাধান্য নিয়ে গভীর আলোচনা প্রায়ই থাকে না। এতে মানুষ শেখে—ভালোভাবে বাঁচা নয়, বরং ভালো লাগাই যেন জীবনের প্রধান লক্ষ্য।’
এ কারণে অস্বস্তি তখন ব্যর্থতা বলে মনে হয়। উদ্বেগকে দেখা হয় পাত্তা না দেওয়ার জিনিস হিসেবে। অথচ হওয়ার কথা ছিল এসব সহ্য করে অর্থপূর্ণ কিছুর দিকে এগোনো। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ কম সহনশীল হয়ে পড়ে। এমন কিছুকে কেন্দ্র করে জীবন সাজানোর কথা যে তারা শেখেনি। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবনে উদ্দেশ্য খুঁজে পায়, তারা চাপ, অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। আর যখন জীবন অর্থহীন লাগে, তখন উপসর্গ কমলেও কষ্ট বাড়ে।
এখানেই মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অনেক প্রচারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। এগুলো প্রেক্ষাপট না বলে কেবল কৌশল শেখায়, দিকনির্দেশনা দেয় না। মানুষ কী অনুভব করছে, সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। আত্মসহমর্মিতা শেখালেও দায়িত্বের কথা বলে না। সচেতনতা থাকলেও প্রতিশ্রুতি থাকে না। ফলে মানুষ আপাতদৃষ্টিতে কিছু সময়ের জন্য ভালো থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে একটা লুফের ভেতর আটকে যায়। তারা কষ্ট সামলাতে শিখলেও কিসের জন্য এই শেখা, সেটা জানে না।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল মার্সটন বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট শুরু করার জায়গা হতে পারে। তাই বলে এগুলো ভুল নয়। তবে স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য দরকার মানুষ কীভাবে বাঁচতে চায়, কিসের জন্য কষ্ট করতে রাজি আর কেন কষ্ট সহ্য করাটাও মূল্যবান—এসব নিয়ে গভীর ভাবনা। তাই মানসিক সুস্থতা শুধু ভালো লাগার বিষয় নয়। এটা এমন এক জীবন গড়ে তোলার ব্যাপার, যেখানে কখনো কখনো খারাপ লাগাটাও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
সূত্র: সাইকোলজি টুডে