অন্ধকার পাহাড়পথ ও শুভর নীরব ভালোবাসা

চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে শান্ত জলধারা আর পানিতে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি—যেন বাস্তব পৃথিবীর কোনো পরিচিত জায়গায় নয়, ছবির ভেতর দাঁড়িয়ে আছি।

সঙ্গে অনেকে থাকায় ভয় পেলাম না। নাফাখুমে বেশিক্ষণ না থেকে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এই পথে ফিরে আসার সময় নাফাখুম ঘুরে দেখা হবে—সবাই মিলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

জিন্নাপাড়া অভিমুখী যাত্রার ওই পর্বটা ভিন্ন রকম। ১২ জন মোট চারটি দলে ভাগ হয়ে গেলাম। প্রতিটি দলে একটা করে টর্চলাইট। সবার সামনে আছেন ট্যুর গাইড শিমিয়ান দাদা। তিনি পাহাড়ি পথের খুঁটিনাটি সবই জানেন। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর আমরা সবাই পিঁপড়ার লাইনের মতো অনুসরণ করছিলাম। অচেনা, অন্ধকার ওই পথে যান্ত্রিক কোনো কোলাহল নেই। পাশ দিয়ে বহমান জলধারার কলকল ধ্বনি, জ্যোৎস্নার আলো এবং পাহাড় থেকে আসা বিভিন্ন রকম শব্দ সেই রাতটাকে সত্যিই বিশেষ করে তুলেছিল।

মন হারিয়ে যায় অচেনা পাহাড়ি পথের আলোর দিশারি, আকাশের স্নিগ্ধ চাঁদটির প্রেমে। অনেকক্ষণ হাঁটার কারণে খুবই ক্ষুধা লেগেছিল সবার। একজনের ব্যাগে এক পোয়া মুড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না। চাঁদের আলোয় কোনো এক বিশাল পাথরের ওপর বসে সবাই মিলে ওই মুড়ি খেলাম। শরীরে ক্লান্তি এবং পেটে ক্ষুধা থাকায়, সেদিন রাতে ওই অল্প মুড়িই সবচেয়ে সুস্বাদু লেগেছিল। জ্যোৎস্নার আলোয় খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। কখন পৌঁছাব জিন্নাপাড়ায়? প্রশ্নটা সবাই বারবার করছিল শিমিয়ান দাদাকে। শরীর যেন আর পারছিল না ধকল সইতে। এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা হেঁটে রাত সাড়ে নয়টার দিকে পৌঁছালাম জিন্নাপাড়ায়।

দিনের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দেওয়ার পর পাহাড়ি এই ছোট্ট পাড়ায় পৌঁছে মনে হয়েছিল, যেন সভ্যতার চেনা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অন্য এক জগতে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা যেদিন জিন্নাপাড়ায় পৌঁছাই, সেদিন ছিল খ্রিষ্টানধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিন। ফলে পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যেও ছিল উৎসবের আলাদা এক আবহ। আমরা যে বাড়িটিতে উঠেছিলাম, সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

পাহাড়ের মানুষের আতিথেয়তা সত্যিই অনন্য। জুমচাষের ফসল, পাহাড়ি পরিবেশে উৎপাদিত নানা উপকরণ এবং বাড়িতে পালন করা হাঁসসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে আমাদের জন্য রান্না করা হয়। এমন স্বাদের খাবার আগে কখনো খেয়েছি কি না, মনে করতে পারি না। খাবারের উপকরণের চেয়েও বেশি ছিল সেই খাবারে পাহাড়ি মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার স্বাদ।

খাওয়াদাওয়া শেষে উপভোগ করলাম জীবনের প্রথম পাহাড়ি বড়দিনের উৎসব। নিজেদের মতো করে তারা একটি মঞ্চ সাজিয়েছিল। সেখানে নিজেদের ভাষায় লেখা ও গাওয়া গান পরিবেশন করে এবং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নৃত্যও ছিল। আমরা গানগুলোর সব কথা বুঝতে পারিনি। কিছু কিছু অংশ বোঝা যাচ্ছিল, কিন্তু বেশির ভাগই ছিল তাদের নিজস্ব ভাষার গান। তবে আনন্দের ভাষা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল, তারা শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অনুষ্ঠান করে থেমে থাকেনি। নেচে-গেয়ে, দলবদ্ধভাবে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বড়দিনের গান পরিবেশন করে। আমরা যে বাড়িতে ছিলাম, সে বাড়িতেও এসেছিল। পর্যায়ক্রমে অন্য বাড়িতেও যায়। পাহাড়ের প্রতিটি বাড়ি যেন সেই রাতে একটি বড় পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে।

উৎসব শেষে শীতের রাত আরও গভীর হয়ে এল। শীতের তীব্রতা ছিল বেশি। আমাদের জন্য গরম কাঁথা ও কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়। ক্লান্তি আর পরদিনের পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরেই আবার নতুন পথচলা শুরু করতে হবে।

পরদিন আমাদের পরিকল্পনা ছিল দেবতা পাহাড় থেকে নেমে মূল গন্তব্য আমিয়াখুম ও ভেলাখুমের দিকে যাওয়া। গাইড শিমিয়ন দাদা অসুস্থ থাকায় সেদিন সকালে যেতে পারেননি। পরিবর্তে গাইড হিসেবে দেওয়া হয় জিন্নাপাড়ারই ক্লাস টেনে পড়ুয়া কিশোর শুভকে। বড়দিনের ছুটিতে সে বাড়িতে এসেছিল। পাহাড়েই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমরা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে দেবতা পাহাড়ে উঠি। পাহাড়টি অত্যন্ত খাড়া। পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি ছিল না। ফলে ওঠার সময় প্রচুর কষ্ট হয়। দেবতা পাহাড়ে পৌঁছে যখন নিচের দিকে তাকালাম, বুঝলাম আসল পরীক্ষা বোধ হয় এখনো বাকি। এই বিশাল খাড়া পাহাড় বেয়েই আবার নিচে নামতে হবে।

আমাদের দলে মোট ১২ জন ছিলাম। পাহাড়ের ঢাল দেখে সবার সাহস একরকম ছিল না। চারজন শেষ পর্যন্ত নিচে নামার সাহস করতে পারেনি। বাকিরা ধীরে ধীরে, অনেক সতর্কতার সঙ্গে এবং প্রচুর সময় নিয়ে নামতে শুরু করলাম। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় হাতে বাঁশের লাঠি রাখা খুবই প্রয়োজনীয়। ওঠা বা নামার সময় ভারসাম্য ধরে রাখতে এটি অনেক সাহায্য করে। তবু আমাদের মতো সমতলের মানুষের জন্য পথটি অত্যন্ত কষ্টকর। এই কষ্টের মধ্যেও বারবার মুগ্ধ হয়েছি। এক পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের আরেক পাহাড়ের সারি, চারপাশের অসীম সবুজ, প্রকৃতির গভীর নীরবতা—সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি।

আরও পড়ুন

পথিমধ্যে বিভিন্ন পাহাড়ি পাড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যতটা সম্ভব তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমরা পর্যটক হিসেবে কয়েক দিনের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। তাই পাহাড়ের প্রতিটি দৃশ্য ছিল নতুন ও রোমাঞ্চকর। কিন্তু সেই পাহাড়ই কারও জন্মভূমি, কারও শৈশব, কারও সারাজীবনের সংগ্রামের জায়গা।

দেবতা পাহাড় থেকে অনেক কষ্টে নেমে প্রথমে গেলাম ভেলাখুমে। এই স্থানের বিশেষত্ব হলো, নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাঁশের ভেলা। ভেলায় চড়ে খুমের পানির ওপর দিয়ে এগোতে হয়। চারপাশের সবুজ প্রতিচ্ছবি পানির রংকে আরও গভীর সবুজ করে তোলে। স্বচ্ছ ও সবুজ সেই পানি দেখে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই একটি বিশাল আয়না বিছিয়ে রেখেছে। সেই জায়গার সৌন্দর্য ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে শান্ত জলধারা আর পানিতে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি—যেন বাস্তব পৃথিবীর কোনো পরিচিত জায়গায় নয়, ছবির ভেতর দাঁড়িয়ে আছি।

এরপর গেলাম আমিয়াখুম। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সেখানে পৌঁছানো যেমন কঠিন, সৌন্দর্যও তেমনই অসাধারণ। আমার এক বন্ধু এবং আমি দুজনেই সাঁতার জানতাম। তাই অনেক ওপর থেকে ঝরনার পানিতে লাফ দেওয়ার সাহস করি। নিচে ঝরনার পানির প্রবাহে একটি বাঁশের ভেলাও পেয়েছিলাম। ঝরনা থেকে প্রবাহিত জলধারায় সেই ভেলায় ভেসে বেড়ানো ছিল ভ্রমণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

আরও পড়ুন

ঘোরাঘুরি ও গোসলের সময় ব্যাগে হালকা কিছু বিস্কুট ও খাবার ছিল। এখানেই ঘটে একটি ঘটনা, যা পরে আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমরা সমতলের মানুষ। পাহাড়ি পরিবেশে ভ্রমণে গিয়ে অনেক সময় অজান্তেই এমন কিছু করি, যা সেই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরাও সেদিন বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট ও ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলে দিচ্ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমাদের সঙ্গে থাকা শুভ সেই ফেলে দেওয়া প্যাকেটগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে তার ব্যাগে রাখছে। বিষয়টি দেখে প্রথমে বিস্মিত হই। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন সে এমনটা করছে?’
শুভ খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, তারা পাহাড় ও প্রকৃতিকে খুব ভালোবাসে। পাহাড় তাদের বাড়ি। তারা চায় আশপাশ পরিষ্কার থাকুক। কোথাও পানির বোতল বা কোনো প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখলে নিজেরাই তা কুড়িয়ে নেয়।

তার কথাটি ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমরা অনেক সময় পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গেলেও সেই সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব নিতে ভুলে যাই। অথচ পাহাড়ের মানুষ, যাদের জীবনই নানা সীমাবদ্ধতায় ভরা, তারাই নিজেদের পরিবেশকে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি যত্নে আগলে রাখে। শুভর সেই কাজ আমাদের শেখায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; তাকে রক্ষা করাও ভালোবাসার অংশ।

কিছু দূর হাঁটতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম। অথচ আমাদের গাইড শুভকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। এমনও হয়েছে, আমাদের কারও ব্যাগ সে নিজেই বহন করেছে। দেবতা পাহাড়ের মতো খাড়া পাহাড়ে আমরা যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে থেমে যাচ্ছিলাম, সেখানে সে স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল।

আরও পড়ুন

সেই সময় মনে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—এই পাহাড়ে মানুষ এত কষ্ট করে থাকে কীভাবে? এ বিষয়ে শুভর সঙ্গে কথা বলি। জানতে পারলাম, সে আলীকদম উপজেলার একটি স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে। কিন্তু তার বাড়ি জিন্নাপাড়ায়। আলীকদমে পড়তে যাওয়ার জন্য প্রথমে জিন্নাপাড়া থেকে হেঁটে রেমাক্রি আসতে হয়। এরপর রেমাক্রি থেকে কয়েক ঘণ্টার নৌযাত্রা করে থানচিতে। তারপর থানচি থেকে বাস, সিএনজি বা অন্য যানবাহনে আলীকদম। একজন শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়ার পথই যদি এমন হয়, তাহলে পাহাড়ি জীবনের অন্য প্রয়োজনগুলো কতটা কঠিন হতে পারে, তা ভাবতে বাধ্য হলাম।
শুভকে জিজ্ঞেস করলাম, এত কষ্টের জীবন কি কখনো তাকে বিরক্ত করে না? সে কি আমাদের মতো সমতলের মানুষের জীবন যাপন করতে চায় না?
শুভর উত্তর ছিল অত্যন্ত সহজ, কিন্তু গভীর। তারা পাহাড়কে ভালোবাসে। পাহাড়েই তাদের জন্ম, পাহাড়েই বেড়ে ওঠা। পাহাড়েই তাদের শৈশব কেটেছে। তাই সব কষ্টের মধ্যেও তারা পাহাড়েই থাকতে চায়।

পাহাড়ের চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। কেউ খুব অসুস্থ হলে কীভাবে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করে?
এই প্রশ্নের উত্তরে শুভ তার নিজের জীবনের একটি বেদনাদায়ক ঘটনা শেয়ার করে। তার আপন বোন একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। দ্রুত চিকিৎসার জন্য থানচিতে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জিন্নাপাড়া থেকে থানচি যাওয়ার পথ তো সহজ নয়। প্রথমে কয়েক ঘণ্টা হেঁটে রেমাক্রি পৌঁছাতে হয়। এরপর আবার নৌকায় কয়েক ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে থানচি। শুভর বোনকে অসুস্থ অবস্থায় কাঁধে করে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে রেমাক্রি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে নৌকায় করে থানচির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পথেই বোনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি শুনে আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই।

শুভর জীবনের এ ঘটনার পুরো বিবরণ আর তার ভেতরে জন্ম নেওয়া একটি স্বপ্নের গল্প—জানতে চোখ রাখুন এই কাহিনির তৃতীয় ও শেষ পর্বে। (চলবে...)

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়