সাঙ্গু নদীর বুকে রহস্যময় যাত্রা

যে বান্দরবান দেখেনি, সে আসলে বাংলাদেশের আসল রূপ দেখেনি।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত দুর্গম বান্দরবানের থানচি উপজেলা। ২০২৩ সালের শীতকালে ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছিল সেখানে। অনেক অদেখা জিনিসকে নতুনভাবে দেখা এবং আগে দেখা জিনিসগুলোকে নতুন রঙে দেখার যে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, তা আসলেই অতুলনীয় এবং জীবনে সঞ্চয় করে রাখার মতো।

গহিন বান্দরবানে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন ঝরনা, ঝিরিপথ, খুম এবং দানবসদৃশ পাহাড় দেখার পর অনুভূতি অনেকটা এমন ছিল—‘এগুলোই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের রূপ, রং এবং লাবণ্য।’ এ জন্যই হয়তো একটা কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, ‘যে বান্দরবান দেখেনি, সে আসলে বাংলাদেশের আসল রূপ দেখেনি।’

সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্য
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তবে দুর্গম বান্দরবানের রূপ ও লাবণ্য দেখার বিষয়টি একজন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন রকম হতে পারে। সাধারণত যাঁরা পর্যটক হিসেবে পাহাড়ে ঘুরতে যান, তাঁদের চোখ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিমোহিত হয় পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠ বলেও একটা কথা আছে। যাঁরা পাহাড়ে স্থায়ীভাবে থাকেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁদের অসহনীয় কষ্টে জীবনযাপন করতে হয়। আমরা পর্যটকেরা সেখানে কয়েক দিনের জন্য অবস্থান করি বিধায়, পাহাড়িদের অবর্ণনীয় কষ্ট আমাদের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়।

থানচির খুব গহিনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। থানচি ব্রিজের নিচে নেমে সাঙ্গু নদী। ট্যুর গাইড সঙ্গেই আছেন। ওনার নাম শিমিয়ান ত্রিপুরা। নৌকায় চড়ার পর যাত্রা শুরু হলো। দুই পাশে বিশাল পাহাড়, কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এই নদীর সঙ্গে বাংলাদেশের অন্য কোনো নদীর তুলনা হতে পারে না। নৌকা চলছে তার আপনগতিতে। সাঙ্গুর অববাহিকায় গড়ে ওঠা পাহাড়ি গ্রামগুলো অবলোকন করলাম নৌকায় বসেই।

বন্ধুদের সঙ্গে সাঙ্গু নদীর বুকে
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

নদীর দুই পাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে এবং প্রকৃতির সঙ্গে পাহাড়িদের বোঝাপড়া ও সখ্যতা—এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় দৃষ্টিপট ঝাপসা হয়ে গেল। নৌকার গতি এবং নদীর পানির মিথস্ক্রিয়ায় ছিটকে আসা পানির ঝাপটা চোখে পড়ায় আবার দৃষ্টি স্বাভাবিক হলো। সাঙ্গুর পানিতে নিজের চেহারা এবং পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেকে নতুন ভঙ্গিমায় আবিষ্কার করলাম। প্রকৃতির রং আমাকে যেন নতুন রূপে সাজিয়েছে, তা–ই মনে হলো।

সাঙ্গু বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন রকম। এই নদীতে প্রচুর পাথর থাকায়, একদিকে এগুলো যেমন সৌন্দর্যের মাত্রাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে; তেমনি পাথরগুলো যাত্রাপথের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। কখনো কখনো নৌকায় থেকে নেমে পায়ে হেঁটেও কিছুটা পথ পাড়ি দিতে হয়। এই পাথরগুলোর মধ্যে খুবই বিখ্যাত হলো রাজা পাথর। বিশাল আকৃতির কারণে এই নামে সমধিক পরিচিত। শীতকালীন ঠান্ডা হাওয়া এসে পুরো শরীরকে শীতল করে তুলেছিল। দুপুরের খাবার খেতে হলো নৌকায় বসেই। থানচি ব্রিজ থেকে যাত্রা শুরু করে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পৌঁছালাম রেমাক্রি। অসম্ভব সুন্দর একটা জায়গা এই রেমাক্রি। ওখানকার পরিবেশ, প্রকৃতি দেখলে মনে হয়, এ যেন কোনো শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা এক অনন্য সৃষ্টি।

আরও পড়ুন

রেমাক্রি ঘুরে এবার পায়ে হাঁটার পালা। মূল গন্তব্য আমিয়াখুম ও ভেলাখুম। ওখানে এক দিনে পৌঁছানো সম্ভব নয়। রেমাক্রি থেকে জিন্নাপাড়ায় গিয়ে রাত্রিযাপন এবং সেখান থেকে সকালে রওনা হয়ে দেবতা পাহাড় ওঠা এবং নামা শেষে আমিয়াখুম ও ভেলাখুম পৌঁছানোই মূল উদ্দেশ্য। রাতেও দুর্গম পাহাড়ে ট্রেকিং করতে হবে। এ জন্য রেমাক্রির একটা ছোট্ট টম দোকান থেকে অনেকগুলো টর্চলাইট কিনতে হলো। জিন্নাপাড়ায় গিয়ে যাঁর বাড়িতে আমাদের থাকতে হবে, তিনি থানচি বাজার থেকেই আমাদের সঙ্গে অন্য একটি নৌকায় এসেছেন। ওনার নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। তাঁর হাতে অনেকগুলো ডিম। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসই তাঁদেরকে এভাবে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে থানচি বাজারে এসে কেনাকাটা করে, একই পথে আবার পাহাড়ে ফিরতে হয়।

বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

উনিও আমাদের সঙ্গে হাঁটা শুরু করলেন। পাহাড়ের এই দুর্গম পথে চলার অভিজ্ঞতা একদমই না থাকায়, খুব অল্পতেই আমরা হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম। কাঁধের ব্যাগ অনেক ভারী হওয়ায়, শিমিয়ান দাদা আমার ব্যাগটা নিজে বহন করার জন্য নিলেন। ছোট-বড় অনেকগুলো ঢিবি, ঝিরিপথ, অবারিত বয়ে চলা জলধারা পার হয়ে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম নাফাখুম জলপ্রপাতে। ততক্ষণে পাহাড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারদিক থেকে বিভিন্ন রকম শব্দ কানে ভেসে আসছে। এই শব্দগুলো একদমই পরিচিত নয়। গ্রামের বাড়ির ঝিঁঝি পোকার ডাকের মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা শব্দ। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ ঘোর অন্ধকার হয়ে গেল। গা ছমছম করতে শুরু করল।

গা ছমছম করে ওঠা সেই মুহূর্তে ঠিক কী ঘটেছিল, আর অন্ধকার পাহাড়ি পথে আমাদের যাত্রা কোন দিকে মোড় নিল, তা জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে। (চলবে...)

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়