রাষ্ট্রের ঘরে গিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে চেনা
গল্পের খোঁজে যখন গন্তব্য থাকে ইতিহাস, তখন গন্তব্যের চেয়ে অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে বড় বিস্ময়। ইট, কংক্রিট আর জলের নিঃশব্দ কথোপকথনে গড়া এক স্থাপত্য—বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবন। বইয়ের পাতায় বহুবার দেখা এই ভবনের সামনে বাস্তবে দাঁড়ালে বোঝা যায়, কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে কতটা দূরত্ব থাকতে পারে। ২৭ আগস্ট গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল ওয়ারেছের আমন্ত্রণে সেই দূরত্ব ঘুচে যায় আমাদের ৩৪ জনের একটি দলের জন্য। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সাঘাটা-ফুলছড়ির এই শিক্ষার্থীদের কাছে দিনটি হয়ে থাকবে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় এক অধ্যায়।
ভবনের প্রধান ফটকে আমাদের অভ্যর্থনা জানান সংসদ সদস্যের সহকারী শাকিল আহমেদ। তিনি সারা দিন আমাদের সঙ্গী হয়ে গোটা কমপ্লেক্স ঘুরিয়ে দেখান। ভেতরে ঢোকার আগে একের পর এক নিরাপত্তা তল্লাশির স্তর পেরোতে হয়। প্রতিটি ধাপেই কঠোর যাচাই-বাছাই, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে প্রথম থেকেই একটা ধারণা দিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়া শেষে ভবনের ভেতরে পা রাখার মুহূর্তেই গা–ছমছমে এক অনুভূতি হয়। চারপাশে বিশালাকার স্তম্ভ, মাথার ওপর সুউচ্চ ছাদ, আর নিস্তব্ধতার ভেতর যেন এক ভারী গাম্ভীর্য বাসা বেঁধে আছে।
প্রয়োজনীয় সব ধাপ পেরিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল দর্শক গ্যালারি। কাচঘেরা সেই উঁচু আসনে বসে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ে সংসদের চলমান তৃতীয় অধিবেশনের দৃশ্য। ঠিক সামনাসামনি স্পিকারের মহিমান্বিত আসন, একপাশে সারিবদ্ধভাবে বসা সরকারি দলের সদস্যরা, আরেক পাশে বিরোধী দলের আসন। বইয়ে পড়া দলীয় অবস্থানের সেই বিন্যাস চোখের সামনে বাস্তবে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অন্য রকম। এত দিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখা পরিচিত মুখ ও দলীয় নেতাদের সরাসরি নিজ নিজ আসনে বসে থাকতে দেখা, প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্যস্ত আইনপ্রণেতাদের তর্ক-বিতর্ক, স্পিকারের আসনের গাম্ভীর্য, আর কার্যপ্রণালির নিয়মে বাঁধা এক শৃঙ্খলাবদ্ধ জগৎ—সব মিলিয়ে গ্যালারিতে বসে থাকা প্রতিটি মুহূর্তই ছিল রোমাঞ্চকর।
গ্যালারিতে অবস্থানকালে এবং পরবর্তী সময়ে শাকিল আহমেদ আমাদের সংসদ ভবনের বেশ কিছু চমৎকার অভ্যন্তরীণ পরিচিতি ও তাৎপর্যপূর্ণ স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেন। তিনি জানান, মূল অধিবেশন কক্ষের পরাবৃত্তাকার ছাদটি প্রায় ১১৭ ফুট উঁচু এবং এতে ব্যবহৃত হয়েছে স্বচ্ছ উপকরণ ও এক বিশেষ জ্যামিতিক কৌশল, যার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো অষ্টভুজাকৃতির কাঠামো ভেদ করে সরাসরি কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে। আর ছাদ থেকে নেমে আসা ঝাড়বাতিগুলো পুরো কক্ষটিকে দেয় নান্দনিক মাত্রা। আগে সংসদ ভবনের গ্যালারিগুলোর নামকরণ করা হতো বিভিন্ন ফুল ও নদীর নামে। তবে সম্প্রতি মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে গ্যালারিগুলোর নতুন নামকরণ করা হয়েছে তাঁদের নামে।
স্পিকারের আসনের ঠিক পেছনের দেয়ালে সম্প্রতি যুক্ত করা হয়েছে পবিত্র কালেমা তাইয়্যেবার আরবি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো কক্ষের আবহে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গাম্ভীর্য যুক্ত করেছে। আসন বিন্যাসের প্রথা অনুযায়ী, সবচেয়ে সামনে উঁচু মঞ্চে থাকেন স্পিকার, তাঁর ডান পাশে বসেন সরকারদলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা, আর বিরোধী দলের সদস্যরা আসন গ্রহণ করেন অন্য প্রান্তে—এই সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের মধ্য দিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপ ফুটে ওঠে। সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের মসজিদটি ভবনের নান্দনিক স্থাপত্যিক ভারসাম্য বজায় রেখে গড়ে তোলা হয়েছে।
অধিবেশন শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভবনের ক্যাফেটেরিয়ায়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প জমে উঠতে না উঠতেই ঘরে প্রবেশ করেন সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ। আন্তরিক হাসিমুখে তিনি প্রত্যেকের নাম জিজ্ঞেস করেন, পড়াশোনা নিয়ে কথা বলেন, ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা শোনেন। রাজনীতির ভারী চেহারার আড়ালে থাকা এক সহজ-সরল মানুষকে সেদিন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। কথোপকথনের পরে বাইরে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তোলা হয় একটি দলীয় আলোকচিত্র, যা হয়তো বছরের পর বছর আমাদের মুঠোফোনের গ্যালারিতে থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে।
এরপর আমরা এগিয়ে যাই ভবনের বাকি অংশ দেখতে। হাঁটতে হাঁটতে দেখা মেলে উত্তর ও দক্ষিণ প্লাজার—খোলা আকাশের নিচে বিস্তৃত সেই চত্বরে দাঁড়ালে মনে হয়, ভবনটি যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। পুরো সংসদ ভবন কমপ্লেক্স প্রায় ২০০ একর জমির ওপর বিস্তৃত। এই কমপ্লেক্স তিনটি ভাগে বিভক্ত—প্রায় ৮ লাখ ২৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের মূল প্লাজা, প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার বর্গফুটের দক্ষিণ প্লাজা এবং প্রায় ৬৫ হাজার বর্গফুটের রাষ্ট্রপতি প্লাজা। এই বিশাল পরিসরের হিসাব শুনে বোঝা যায়, কেন একে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আইনসভা ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়। পাশেই ক্রিসেন্ট লেকের স্বচ্ছ জলে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যের আলো, আর দূর থেকে দেখলে মনে হয় গোটা কাঠামোটি যেন পানির ওপর ভেসে আছে।
প্লাজা পেরিয়ে আমরা পৌঁছাই জাতীয় সংসদের গ্রন্থাগারে। বইয়ের সারি, পুরোনো নথিপত্রের গন্ধ আর নীরবতার ভেতর শাকিল স্যার সংক্ষেপে তুলে ধরেন সংসদ ভবনের জন্মকথা—কীভাবে স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চাকে স্থায়ী রূপ দিতে এই ভবন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। লাইব্রেরির স্থাপত্যও নজর কাড়ার মতো। পুরো কক্ষে চোখে পড়ে মাত্র একটি বড় স্তম্ভ, যার রং ও গড়ন দূর থেকে দেখলে অনেকটা মাটির মতো মনে হয়। লুই আই কানের নকশার একটি বড় বৈশিষ্ট্যই ছিল প্রচলিত অর্থে অতিরিক্ত স্তম্ভ এড়িয়ে চলা। আলোর বিন্যাসের মাধ্যমে দেয়ালে স্তম্ভের মতো ছায়া তৈরি করে তিনি একধরনের স্থাপত্যিক দৃষ্টিভ্রম তৈরি করেছিলেন। এই লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত সংবিধানের বিবর্তনের ইতিহাস, বিরল দলিলপত্র আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গ্রন্থরাজির পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই হাতে লেখা বাংলাদেশের মূল সংবিধানের একটি প্রতিলিপি। মূল কপিটি সংরক্ষিত আছে জাতীয় জাদুঘরে। তবে এর অনুলিপি দেখেও গা শিহরিত হয়ে ওঠে। মনে হয়, একটি জাতির আইনি স্মৃতি যেন এই কয়েকটি কক্ষেই ধরে রাখা হয়েছে।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আমরা যাই সেই জায়গায়, যেখান থেকে স্থপতি লুই আই কানের নকশার আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। ১৯৬২ সালে লুই কান প্রথমবার সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় আসেন। এরপর দেশে ফিরে প্রায় এক বছর সময় নিয়ে সম্পূর্ণ নকশাটি তৈরি করেন এবং ১৯৬৩ সালের মার্চে তিনি পুনরায় ঢাকায় ফেরেন। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, বন্যাপ্রবণ পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে অনুধাবন করেই তিনি নকশায় জলাধার, খোলা প্লাজা আর আলো-বাতাসের বিশেষ বিন্যাস যুক্ত করেন। ইট আর কংক্রিটের জ্যামিতিক বিন্যাস, আলো-ছায়ার খেলা, আর জলাধারের সঙ্গে ভবনের নিখুঁত সামঞ্জস্য—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, এই স্থাপনা কেবল ক্ষমতার প্রতীক নয়, এটি একটি জাতির শিল্পবোধেরও পরিচায়ক।
দিনের শেষে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, গণতন্ত্র শব্দটি আর কেবল পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা নয়, এটি এখন আমাদের কাছে একটি স্মৃতি, একটি অনুভূতি। নিজের এলাকার একজন জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে এত কাছ থেকে দেখার এই সুযোগ শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না, ছিল দেশ ও গণতন্ত্রকে নতুন করে চেনার এক পাঠ।
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়