নদীর জলে ভাসে যাদের জীবন
বরিশালের লাহারহাট ও বুখাইনগরের নদীতে ভাসছিল সারি সারি ছোট ছোট নৌকা। প্রতিটি নৌকাই যেন একেকটা সংসার, একেকটা গল্প। এই নৌকাগুলোতে বসবাস করেন মানতা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। জলই তাঁদের ঠিকানা, নৌকাই তাঁদের ঘর।
২৩ আগস্ট বন্ধু বায়েজীদ ও নবীনের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। তাঁদের পাশে বসি, মন দিয়ে শুনি কথা। এই সম্প্রদায়ের একজন সরদার আছেন, জসিম সরদার। তাঁর ছেলে শফিক ও তার বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের বেশ ভাব জমে যায় দ্রুতই। ওরা আমাদের একটি নৌকায় করে নিয়ে যায় পাশের চরে, সেখানে যাই ফুটবল খেলতে। বালুর চরে দৌড়াদৌড়ি, হাসিঠাট্টা, ঘাম ঝরানো একটি বিকেল। অচেনা মানুষগুলোর সঙ্গে চেনা হয়ে ওঠার এক আশ্চর্য উপলক্ষ। খেলা শেষে বাচ্চাদের সঙ্গে নেমে পড়ি নদীতে গোসল করতে। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, বাচ্চাদের খুনসুটি, হাসির শব্দ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা এখনো চোখে ভাসে।
ধীরে ধীরে তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে, সুখ-দুঃখের সঙ্গে পরিচিত হই। জানতে পারি, লাহারহাট ফেরিঘাটে একটি বেসরকারি সংস্থা মানতা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য একটি ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার গড়ে তুলেছে। ‘অ্যাকসেস টু লার্নিং’ নামের এই কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগ ভাসমান মানতা শিশুদের জন্য শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। সেই আলোই হয়তো একদিন এই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
বেসরকারি সংস্থা মানতা প্রজেক্টের ফ্যাসিলিটেটর সুমন রহমানের সঙ্গেও পরিচয় হয়। স্থানীয় পরিবার আর বাইরের মানুষদের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে তোলার কাজটা তিনিই করে থাকেন। বর্তমানে প্রায় ১০০ মানতা শিশুকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার কাজ করছেন তাঁরা।
কথা হয় খুকি চান বুবু, শিল্পী খালা ও মরিয়ম খালার সঙ্গেও। তাঁদের কথায়, চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক জীবনের বাস্তবতা; যা বইয়ের পাতায় পড়া যায় না, কেবল কাছে গিয়ে শোনা যায়। খুকি চান বুবু এক লাইনেই যেন তাঁদের গোটা জীবনটা বলে দিলেন, ‘আমগো জীবন রৌদে শুকাই, বৃষ্টিতে ভিজি, আর নৌকায় দোল খাই।’
কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথাও একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ঝড়বৃষ্টি এলে এই নৌকাতেই তাঁরা থাকেন, নয়তো আশপাশের কোনো জায়গায় সাময়িক আশ্রয় নেন। মাথার ওপর পাকা ছাদ নেই, নেই ঘর বাঁধার জমি। সম্পদ বলতে ওই একখানা নৌকাই।
এই জনগোষ্ঠীর আয়ের একমাত্র উৎস মাছ ধরা। নদীতে জাল ফেলে যা ওঠে, তা দিয়েই চলে সংসার। মাছ পেলে সেদিন হাঁড়ি চড়ে চুলায়, না পেলে দোকান থেকে বাকিতে চাল-ডাল নিয়ে আসতে হয়। পরে মাছ পেলে সেই দেনা শোধ হয়, কখনো টাকায়, কখনোবা সরাসরি মাছ দিয়েই। কোনো কোনো দিন মাছও জোটে না, দেনাও মেলে না। তখন আবার না খেয়েই কাটাতে হয়। বিশুদ্ধ পানির অবস্থাও করুণ। টিউবওয়েলের পানি কখনো পায়, কখনো পায় না। আর যখন পায় না, তখন ভরসা নদীর ঘোলা পানি।
২০০৮ সালে প্রথম এই জনগোষ্ঠী নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পায়। তার আগে রাষ্ট্রের খাতায় যেন তাদের অস্তিত্বই ছিল না। ধর্মে তারা মুসলিম। মৃত্যুর পর একসময় লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো নদীর জলে। তবে এখন তারা কবর দেওয়ার সুযোগ পায়। এটুকু পরিবর্তন তাদের কাছে অনেক স্বস্তির।
এখানে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের হার এখনো বেশি বলে জানা যায়। লাহারহাট এলাকায় প্রায় ১২৮টি মানতা পরিবার বসবাস করে। বেশির ভাগ পরিবারেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় অল্প বয়সে। তবে খুকি চান বুবু, শিল্পী খালা, মরিয়ম খালাদের কথায় একটা আশার আলোও দেখা যায়। তাঁরা এখন কম বয়সে বিয়ে দিলে যে সমস্যা হয়, তা কিছুটা হলেও বুঝতে শুরু করেছেন। আগের মতো একেবারে অবুঝ নয়, বরং মেয়েটা আর একটু বড় হলে তবেই বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে হলেও এ বদলটা চোখে পড়ার মতো।
যত কাছ থেকে দেখেছি, ততই ভেবেছি, নদীর জলে ভেসে বেড়ানো এই মানুষগুলোর জীবন কতটা কঠিন, অথচ কতটা সহজভাবে তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই—এই মানুষগুলোর মুখে তবু হাসি লেগে থাকে। মানতাদের জীবনের এই সংগ্রাম আমাদের বারবার ভাবায়। নিজেও চেষ্টা করি, যতটুকু সম্ভব তাদের বাল্যবিবাহ ও স্বাস্থ্য নিয়ে একটু একটু করে সচেতন করতে, তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে। এ দিনটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, জীবনকে দেখার একটা নতুন চোখ, নতুন মানবিকতা।
শিক্ষার্থী, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়