ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে ছেড়ে দিয়েও তার ভালো চাইতে পারা।
যৌবনের প্রারম্ভে মানুষ নিজেকে রাজা ভাবে—
কান থাকে, কিন্তু শোনে না;
চোখ থাকে, কিন্তু দেখে না ভবিষ্যতের অন্ধকার স্রোত।
প্রীতমও তেমনই এক যুবক ছিল—
বাড়ির সীমানা পেরিয়ে সদ্য স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে,
ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম-দ্বিতীয় বর্ষে তখন
বইয়ের পাতার চেয়ে অধিক আকর্ষণীয় ছিল একটি কণ্ঠস্বর।
মেয়েটি—
শৈশবের সাথি,
খেলার মাঠের নির্ভেজাল দিনগুলোর সঙ্গী ছিল।
কালের আবর্তে সে-ই হয়ে উঠল হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী।
পাঁচ টাকার বিনিময়ে কেনা দুই শত বার্তা
রাত্রির নক্ষত্রের মতো ঝরে পড়ত প্রীতমের ফোনের পর্দায়।
দুই বছরে সাতাশ হাজার শব্দ—
প্রতিটি যেন প্রতিজ্ঞা,
প্রতিটি যেন চিরন্তনের অঙ্গীকার।
যখন পাঠ্যবইয়ের আহ্বান ছিল প্রবল,
তখন সে ব্যস্ত ছিল ভালোবাসার উপাখ্যানে।
পাঠ্য ছিল ত্রিশ শতাংশ,
আর সত্তরের অধিক ছিল স্বপ্নের সঙ্গে আলাপন।
সে মেয়েটিকে স্থান দিয়েছিল মায়ের পরেই—
সম্মান, শ্রদ্ধা, পূজার আসন।
মাত্র দুই মাস চৌদ্দ দিনের বড় সে,
তবু তার কাছে ছিল অভিভাবকের মতো,
আবার প্রেয়সীর মতোও।
২০১৮ সালে ভার্সিটি অ্যাডমিশনে যখন কোথাও চান্স হলো না, তখন ভীষণ মন খারাপ ছিল প্রীতমের। অন্যদিকে ভালোবাসায় মোড়ানো প্রেমাও দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। প্রীতম আরও ভেঙে পড়ল। যে সময়টাতে প্রিয় মানুষের হাতটা মাথার ওপরে থাকার প্রয়োজন ছিল, সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজন ছিল, সেই সময়ে প্রিয় মানুষটি আরও একঝাঁক দুঃখ বাড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। যেন গোধূলির আলো নিভে গেল অকারণেই। আজ তারা পাশাপাশি দুই ভবনে অধ্যয়ন করে। প্রীতম উদ্ভিদবিদ্যার নীরব সবুজে, প্রেমা রসায়নের রঙিন বিক্রিয়ায়। মাঝখানে শুধু একটি সরু পথ, তবু দূরত্ব সমুদ্রের চেয়ে গভীর। চলতি পথে পাঁচ-ছয়বার দুজন দুজনের মুখোমুখি হয়েছে। চোখাচোখি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নীরবতাই ছিল তাদের আলাপন। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা, আবার যে যার গন্তব্য ধরে চলে যাওয়া। ২০১৮-এর পর আর কোনো সংলাপ নেই, শুধু নীরবতার দীর্ঘ নাটক।
প্রীতমের গ্রামের বাড়ির উঠানেই সারা দিন বসে থাকত প্রেমা। গান শেখার হাতেখড়ি দুজনের একসঙ্গে। প্রীতম হারমোনিয়ামে সুর তুলত, আর প্রেমা পাশে বসে থাকত। এভাবেই সুরের ফাঁকে ফাঁকে জন্ম নিল অন্য এক সম্পর্ক। কেউ কখনো উচ্চারিত ভাষায় কিছুই বোঝায়নি। তবে নীরবে দুজন দুজনকে অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে। একদিন প্রেমা হঠাৎ করেই বলে বসল, ‘আমি কখনো ছাড়ব না তোমাকে। বাবা-মায়ের নামে শপথ।’ তার কণ্ঠে কাঁপন ছিল না। প্রীতম বিশ্বাস করেছিল, কথাগুলোকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছিল।
প্রেমা আস্তে আস্তে বদলে যেতে শুরু করে। ফোনে ব্যস্ততা, গোপন কথা, হঠাৎ অকারণ রাগ। কিন্তু প্রশ্ন করেনি প্রীতম। ভয় পেত। ছেড়ে চলে যাওয়ার ভয়। একদিন প্রীতম জানতে পারে সে কারও সঙ্গে কথা বলে। শুধু কথা নয়—আরও কিছু। একজন মুসলিম ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক, যার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, অবস্থান ভালো। তখন ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। তাও বুকে পাথর চাপা দিয়ে সবকিছু চুপচাপ সহ্য করে যায়।
প্রেমার মুখ দেখলেই সব ভুলে যেত প্রীতম। মনে হতো—এটাই তো ভালোবাসা। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা ভুল হতে পারে না। সে তাকে কখনোই ছোট করেনি। কখনোই না। শুধু নিজেকে ছোট করে ফেলেছিল। এটাই হয়তো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একদিন প্রেমা বলেই ফেলল, ‘তুমি এখন আমার জন্য একটা চাপ হয়ে গেছ।’ প্রীতম হাসল। মনে হলো, কেউ বুকের ভেতর থেকে শ্বাসটা টেনে নিয়েছে। যে মেয়েটা তার উঠানে বসে গান শিখত, যে বলত সারা জীবন পাশে থাকবে—সেই মেয়েটাই আজ তাকে সহ্য করতে পারে না। এখন প্রীতম তার গলার কাঁটা হয়ে গেছে।
এদিকে প্রীতমের বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু সে বলে দিয়েছে, এ জীবনে সে আর বিয়ে নামক সম্পর্কে জড়াতে চায় না। কারণ, ভবিষ্যতের স্ত্রী হয়তো বুঝবে না, কেন তার চোখ হঠাৎ ভিজে ওঠে। সে হয়তো ভাববে—প্রীতম তাকে ভালোবাসে না।
আসলে সে ভালোবাসতে শিখেছিল একবারই। তারপর আর পারেনি। রাতে কখনো ঘুম ভাঙলে প্রীতম জানালার পাশে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে— ‘প্রেমা ভালো থাকুক’।
ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে ছেড়ে দিয়েও তার ভালো চাইতে পারা।
প্রীতম জানত, সে আর ফিরবে না। তবু স্মৃতিগুলো ফিরে আসে। স্মৃতিরা কখনো ধর্ম দেখে না, অবস্থান দেখে না—শুধু হৃদয়ের ভাঙা সুরে বাজতে থাকে।
প্রীতম তার জীবনে নেই। কিন্তু তার জীবনের এক বিশাল অংশজুড়ে প্রেমা রয়ে গেছে। নিঃশব্দে। অমোচনীয়ভাবে।
আর প্রীতম—ভালোবাসার সেই পুরোনো উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যার হাতে এখনো অসমাপ্ত একটা সুর।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, কুষ্টিয়া বন্ধুসভা