এক মাসেই প্রেম থেকে পূর্ণতা

আমরা এই বয়সে ম্যানেজ করতে শিখে গেছি, ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে শিখে গেছি।ছবি: লেখকের সৌজন্যে
আমরা ভাবি, টাকা ছাড়া ভালোবাসা হয়তো জানালা দিয়ে পালায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এই অর্থহীনতাই একে অপরকে পরম যত্নে আগলে রাখার একমাত্র মেডিসিন।

কয়েক বছর আগে এক পড়ন্ত বিকেলে সব জড়তা কাটিয়ে উঠে সে আমাকে বলেই ফেলল, ‘তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে তোমার হাত ধরেই আমি আমার বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই!’

এমন অপ্রস্তুত ঘটনায় হতভম্ব হয়ে সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারিনি। বাসায় গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আম্মুর কাছে বিষয়টি শেয়ার করি। কিন্তু পরক্ষণেই অপর দিক থেকে বিরাট বাধা আসে। পরবর্তী সময় এক কাছের বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করি, যে কিনা তারও খুব কাছের ছোট ভাই ছিল! কিন্তু সেখান থেকেও আশাহত হই। কারণ, আমার সেই বন্ধু ভেবেছিল যে আমি যদি কোনো সম্পর্কে যাই, তাহলে বন্ধুত্ব ভুলে যাব। আর সে জন্যই সে মনগড়া কিছু বানোয়াট কথা বের করে আমাদের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কথায় আছে, মানুষটি সঠিক হলে কোনো সমস্যাই সমস্যা নয়। আমার মানুষটিও তেমন। সে একা হাতে সবকিছু সামলে নেয়।

শুরু হলো আমাদের প্রেম। তখন আমার ইচ্ছা ছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তারপর বিয়ে নিয়ে ভাবব। কিন্তু পরক্ষণে তার করে রাখা পরিকল্পনা দেখে আমি অবাক হই! সে জানায়, আগামী মাসেই বিয়ে করতে চায়। প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তী সময় তার ভালোবাসা ও পাগলামি দেখে তাকে শর্ত দিই, সে যদি আমার আম্মুকে রাজি করাতে পারে, তাহলে আমার বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই।

ধীরে ধীরে সে তার কাছের মানুষদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেয়ার করা শুরু করল। কিন্তু আবারও বাধা হয়ে দাঁড়াল তার কাছের মানুষেরা। তাঁদের ভাষ্যমতে, আমি হয়তো ভেতরে ভেতরে খুব অহংকারী, ওভার মডার্ন, তাকে ব্যবহার করছি, তাকে ছেড়ে চলে যাব… ইত্যাদি। সেই সময়েও এ মানুষটি এসব ব্যাপার আমার অগোচরেই সামলে নেয়।

এবার পরিবারকে রাজি করানোর পালা। সে আম্মুর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে আমাদের প্রেমের সম্পর্কের ইতি টেনে বিবাহিত জীবন শুরুর প্রস্তাব রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আম্মু ঠিক করে নিয়েছেন যে তিনি কিছুতেই এই ছেলের সঙ্গে দেখা করবেন না। অনেক কষ্টে হাত–পা ধরে কান্নাকাটি করে রাগ দেখিয়ে আম্মুকে এই শর্তে রাজি করাতে পারি যে, তিনি দেখা করবেন ঠিকই, কিন্তু ছেলে যেমনই হোক না কেন তিনি রিজেক্ট করে দেবেন, তা–ই হলো। প্রেমের ২০ দিনের মাথায় তার সঙ্গে আমার আম্মুর দেখা করিয়ে দিই এবং সুন্দরভাবে আম্মু বাসায় এসে না করে দেন। কারণ, এই ছেলের ভবিষ্যৎ বলতে তখনো কিছুই নেই।

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তবে আমরা দুজন কখনোই ভেঙে পড়িনি। আগে থেকেই এ রকম ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। যদিও আমি একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিই, তবে সে হাল ছাড়ার পাত্র নয় এবং প্রমাণ করেও দেখিয়েছে।

একদিন ঘড়িতে তখন রাত ১০টা, শীতের রাত। হঠাৎ ভেজা পায়ে স্লিপ কেটে আমি ফ্লোরে পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড ব্যথা পাই। কান্না করতে করতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। বাসায় তখন আম্মু আর আমি একা। আব্বু দেশের বাইরে থাকেন। কোনো পুরুষ মানুষ নেই। আম্মু একা কীভাবে কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। মামাদের কল করা হলো, শুনেই তাঁরা রওনা হলেন। কিন্তু তাঁদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যাবে। আর এতক্ষণে যদি আমাকে বাসায় বসিয়ে রাখা হয়, তাহলে হয়তো শ্বাসকষ্টে মারাও যেতে পারি! এই ভয়ে আম্মু আমার কাছে এসে আস্তে করে জিজ্ঞাসা করে, আমার কোনো বন্ধুকে কল করব কি না। তখন আমার মানুষটিকেই একমাত্র সবচেয়ে কাছের বন্ধু বলে মনে হতো। তাই আম্মুকে ইশারায় তার কথা বলি। আম্মু রাজি না থাকা সত্ত্বেও তাকে কল করেন।

আরও পড়ুন

শুনেই সে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে বাসার সামনে হাজির হয়। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। ততক্ষণে মামারাও চলে আসেন। ডাক্তার চেকআপ করে জানান, তেমন কিছুই হয়নি, একটু অক্সিজেন দিলেই সেরে যাবে। অক্সিজেন নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মোটামুটি সুস্থ বোধ করি। তখন আমার মানুষটিকে সবাই বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য বলেন, কিন্তু সে কিছুতেই যাবে না। আমার ছোট মামার সঙ্গে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেদিন সারা রাত তারা দুজন শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। পরদিন সকালে হাসপাতালে আমার খালামণি, আঙ্কেল ও মামিরাও আসেন। তাঁরা তাকে প্রথমবার দেখেন।

আমি সুস্থ হয়ে নানুর বাড়িতে যাই কিছুদিনের জন্য। তখন বাসায় তাকে নিয়ে প্রচুর আলোচনা হতে থাকে। অন্যদিকে আব্বু জানান, তাঁর একমাত্র মেয়েকে কিছুতেই এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবেন না। তখন নানু, দুই মামা, মামি, আর খালামণি আমাদের অনেক সাহায্য করেছিলেন। প্রথমে তাঁরা আম্মুকে বোঝাতে সক্ষম হলেও আব্বুকে বোঝাতে ব্যর্থ হন। সেই সপ্তাহের শুক্রবারে আম্মু তাকে আমার নানুবাড়িতে দাওয়াত করেন। সেদিনের পর থেকে আম্মুও কিছুটা রাজি হয়ে যান, কিন্তু মুখে প্রকাশ করতেন না। বলা যায়, আমার পরিবার ৮০ শতাংশ রাজি। এবার তার পরিবারকে রাজি করানোর পালা! সেখানেও তার বাবা বাধা হয়ে দাঁড়ান। তবে তার বড় ভাইয়া আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। এরপর তার পরিবারকে রাজি করানো থেকে শুরু করে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সবকিছু বড় ভাইয়া ও আমার আম্মু মিলেই ম্যানেজ করেছিলেন।

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

অতঃপর মাত্র ৩০ দিনে ৩০ লক্ষাধিক সমস্যা মোকাবিলা করে সারা জীবনের জন্য আমরা হয়ে গেলাম একে অপরের। আমাদের সম্পর্কের নাম তখন প্রেমিক–প্রেমিকা থেকে হয়ে গেল স্বামী–স্ত্রী।

সময়টা খুব কম হলেও স্মৃতিগুলো বিশাল। আমরা ভাবি, টাকা ছাড়া ভালোবাসা হয়তো জানালা দিয়ে পালায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এই অর্থহীনতাই একে অপরকে পরম যত্নে আগলে রাখার একমাত্র মেডিসিন। বর্তমানে সে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা পার্টটাইম জব করছে, আমিও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত আছি। এত কিছুর ভিড়েও আমাদের একটি ছোট চড়ুই পাখির বাসা হয়েছে। দুজনে নিজেদের মতো সাজিয়ে নিয়েছি সেই বাসা।

তার স্যালারি কিংবা পজিশন এখনো ভালো পরিমাণে হয়নি। এখনো তার স্যালারি আমার প্রতি মাসে পড়াশোনার পেছনে খরচ হওয়া অর্থের সমান। তবু আমরা এই বয়সে ম্যানেজ করতে শিখে গেছি, ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে শিখে গেছি। বিশ্বাস আছে, দুজনই একদিন সফলতার উচ্চ গণ্ডি পেরিয়ে যাব একে অপরের সহায়তায়। তখন আমাদের একটি সুন্দর ও বেশ বড় চড়ুই পাখির বাসা হবে। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে ছানাও।

আপনারা কি ভেবে নিয়েছেন যে আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের ঝগড়া হয় না? তা কিন্তু মোটেই নয়। আমরা দিনে কম হলেও ১০ বার ঝগড়া করি। ঝগড়া শেষে ১০০ বারের অধিক একে অপরকে ভালোবাসি বলে দিন শেষে কাঁচুমাচু হয়ে তার বুকেই ঘুমিয়ে পড়ি।

আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল ২৬ আগস্ট ২০২২। ঠিক এক মাস পর ২৬ সেপ্টেম্বর সে আমাকে প্রপোজ করে। এর ঠিক এক মাস পর ২৬ অক্টোবর আমাদের বিয়ে হয়।