মায়ের আঁচলে বাঁধা পৃথিবী
শহুরে যানজট, রোদ আর ধুলো মেখে যখন প্রতিদিন ফিরি ঠিকানায়, পথের ধারে কত চিল উড়ে যায়, অসহায় মানুষ পড়ে থাকে ফুটপাতে; তখন ইচ্ছে করে পথের আর পাহাড়ের সব সবুজ বুকপকেটে ভরে মায়ের হাতে তুলে দিই। আমার ডুবুরি মন শুধু খুঁজে ফেরে আর স্বপ্নগুলো ফেরিওয়ালার মতো দূরে হারিয়ে যায়। মায়ের আঁচলে পৃথিবী বেঁধে রাখার স্বপ্ন দেখেছি বারবার। অথচ মা নিজেই আমার পথ বেঁধে দিয়েছেন এক বন্ধনহীন গ্রন্থিতে।
গ্রামের মেঠোপথে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় মাকে খোঁজা মনটা বড় হয়ে গেছে। রান্নাঘরে পাশে বসে মায়ের হাতের রান্না দেখার দিনগুলোয় এখন পাক ধরেছে। মায়ের বুক খালি করে সেই যে চলে এসেছিলাম, এখন ঘরে ফেরা হয় অনেক দেরিতে। সময় তো আর থেমে থাকেনি। গ্রামের কাঁচা রাস্তাটা পাকা রাস্তা হলো। কিন্তু মায়ের হাতে হাত রেখে সেই পথে আর হাঁটা হয় না। পথেপ্রান্তরে কত ফুল ঝরে গেছে, ঝরার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে আমাদের বয়সও। শুধু টের পাই, সব বদলে গেলেও মা ঠিক আগের মতোই আছেন।
হঠাৎ এক রাতে মাকে নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে হলো। আমি সাধারণত কাঁদতে পারি না, লোকসমক্ষে তো আরও নয়। দুঃখে কিংবা অতি আনন্দে—কিছুতেই নয়। বুদ্ধি হওয়ার পর হাতে গোনা কয়েকবারই কেঁদেছি। যতটুকু মনে পড়ে, সিনেমা দেখে একবার, আব্বুর কাপড় দেখে রাতে একবার আর নানু মারা যাওয়ার পর আরেকবার। রাত তখন প্রায় দেড়টা। মন প্রচণ্ড খারাপ, কিছুই ভালো লাগছিল না, ছটফট করছিলাম। মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণ কাঁদতে পারলে হয়তো শান্তি মিলবে।
জীবনের না পাওয়াগুলো হিসাব করে দুঃখ আনার চেষ্টা করলাম, কাজ হলো না। শৈশব-কৈশোরের নিজেকে হারানোর আফসোসে পুড়লাম, তাতেও কান্না এল না। ঠিক তখনই হুট করে চোখে ভাসল মায়ের মুখ। এখানেও এক বিপর্যয় লুকিয়ে আছে—আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের মুখটাও স্পষ্ট মনে রাখতে পারি না। চশমা ছাড়া যেমন ঝাপসা দেখায়, আমার স্মৃতিও তেমনি এক ঘোলাটে ছবি এঁকে দেয়। তবু মায়ের হাঁটাচলা, ছোটবেলায় আমাদের ভাইবোনকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আমাকে নিয়ে ছুটে চলা, খাবার টেবিলে ভাত তুলে দেওয়ার দৃশ্যগুলো ফিরে এল ছায়ার মতো।
একদিন আমার সামান্য বুকে ব্যথা হওয়ায় মায়ের কেঁদে ফেলা, বিদায়ের সময় মাথায় ফুঁ দিয়ে দোয়া পড়া, যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ তাকিয়ে থাকা—এসব শত স্মৃতি ভেবে হঠাৎ হাউমাউ করে কান্না এল। যেন স্লুইসগেটে আটকে রাখা জলের তোড় ভেঙে পড়ল। কতক্ষণ কেঁদেছিলাম, মনে নেই। তারপরের প্রশান্তি এই যাপিত জীবনে এক বিরল স্বস্তি এনে দিয়েছিল।
এত কিছুর মধ্যেও বড় ইচ্ছা ছিল, মায়ের সব দুঃখ পাতালপুরীর কোনো কৌটায় লুকিয়ে রাখব। অথচ বিপরীতক্রমে পূর্ণিমার আলোর মতো সে দুঃখ ছড়িয়ে দিয়েছি চারদিকে। আমি যেমন বায়েজিদ বোস্তামী কিংবা বিদ্যাসাগর হয়ে উঠতে পারিনি, তেমনি হয়তো আমার মা–ও হতে পারেননি কোনো উপন্যাসের নায়িকা। তবু পৃথিবীর এই স্বল্প সময়ের দোলাচলে তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, তার চেয়ে দামি আর কী হতে পারে! এই নির্ভার জীবনের বাতিঘর যেদিন নিভে যাবে, জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকাটা কি আদৌ বেঁচে থাকা হবে? হয়তো সময় কাটবে, হয়তো কাটবে না। তবু পৃথিবীর সবচেয়ে নিগূঢ় এই ভালোবাসা টিকে থাকুক চিরকাল।