যে দেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি উপকূলীয় দ্বীপের চেয়েও কম
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আসরে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেছিল কুরাসাও। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার ঠিক উত্তরে, ক্যারিবিয়ান সাগরের দুটি দ্বীপ নিয়ে দেশটি গঠিত। এর আয়তন বাংলাদেশের কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল কুতুবদিয়া দ্বীপ থেকে প্রায় ৮ গুণ অধিক হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপের চেয়ে প্রায় চার-তৃতীয়াংশ কম।
জনসংখ্যায় বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেওয়ার পর তাদের পরিচিতিটা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দেশের ভৌগোলিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে। যদিও ‘কুরাসাও’ নামক দেশটি ২০২৩ সালের মার্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল। সেই ম্যাচের আগে এই ক্যারিবিয়ান দেশের নামও জানতেন না অনেকেই।
বাংলাদেশের যে দ্বীপের জনসংখ্যা কুরাসাও থেকে বেশি
কক্সবাজারের উপকূলীয় পর্যটনের অন্যতম সম্ভাবনাময় দ্বীপ কুতুবদিয়া। প্রায় ছয় শ বছর আগে বা চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠেছিল ৮৩ দশমিক ৩২ বর্গমাইল বা ২১৫ দশমিক ৮০ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডের এই দ্বীপ। পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে এখানে প্রথম জনবসতি শুরু হয় মগ-পর্তুগিজদের মাধ্যমে। যারা আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল ও সমুদ্রের মালবাহী জাহাজে লুটপাট চালাত এবং মানুষ হত্যা করত নির্দয়ভাবে। পরে এখানে কুতুবুদ্দীন নামের এক দরবেশ তাঁর শিষ্য আলী আকবর, আলী ফকিরসহ আরও সঙ্গী নিয়ে আগমন করে আস্তানা গড়ে তোলেন এবং মগ-পর্তুগিজদের বিতাড়িত করেন।
এর আরও অনেক বছর পরে আরাকান থেকে নির্যাতিত হয়ে পলায়নরত রোহিঙ্গা মুসলিমরা কুতুবদিয়া দ্বীপে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন এবং তাঁরা দরবেশ কুতুবুদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ দ্বীপের নামকরণ করেন কুতুবুদ্দীনের দিয়া, যা পরবর্তী সময়ে কুতুবদিয়া নামে স্বীকৃতি লাভ করে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের আগমনের ফলে এখানে ধীরে ধীরে মানুষের বিশাল জনপদ গড়ে ওঠে।
কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও সাগরের উত্তাল ঢেউ এবং স্রোতের কারণে দ্বীপের ভূখণ্ড সমুদ্রে বিলীন হওয়ার ফলে অস্তিত্বসংকটের মুখে পড়েছে দ্বীপটি। সমুদ্রগর্ভে বিলীন হতে হতে দ্বীপের আয়তন এখন মাত্র ২৩-২৫ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে ২০২২ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬২২ জন। তবে সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের সর্বশেষ অনুসন্ধান অনুযায়ী কুতুবদিয়া দ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭ হাজারের অধিক। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
কুরাসাওয়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও আয়তন
ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত দুটি দ্বীপ নিয়ে একটি ছোট্ট দেশ কুরাসাও। দুটি দ্বীপের মধ্যে একটি ‘কুরাসাও’ মূল দ্বীপ এবং অন্যটি জনবসতিহীন ‘লিটল কুরাসাও’ দ্বীপ। কুরাসাও ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার পাশে হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কনক্যাকাফ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে। কুরাসাও ১৮১৫ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত কুরাসাও অ্যান্ড ডিপেনডেন্সিস কলোনির অংশ ছিল। এরপর ১৯৫৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের রাজ্যের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে ছিল। বর্তমানে যদিও এটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, তবে পরাধীনও বলা যায় না।
নেদারল্যান্ডস রাজ্যের কাছ থেকে কুরাসাও একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা পেয়েছিল ২০১০ সালে। তারা মূলত কিংডম অব নেদারল্যান্ডসের অন্তর্গত স্বায়ত্তশাসিত একটি রাষ্ট্র। যেখানে তাদের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির নিয়ন্ত্রণ নেদারল্যান্ডসের হাতে থাকলেও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেশটি পুরোপুরি স্বাধীন। কুরাসাওর রাজধানীর নাম উইলেমস্টাড, যা দেখলে মনে হবে পুরো শহরটি তুলি দিয়ে অঙ্কন করা হয়েছে। চারদিকে লাল, হলুদ, সবুজ, কমলাসহ বিভিন্ন রঙের সারি সারি ভবন। একসময় এই ভবনগুলো ছিল ধবধবে সাদা। ১৮১৭ সালে রোদের ঝলকানিতে চোখের ক্ষতি এবং এর ফলে সৃষ্ট মাথাব্যথার কারণ দেখিয়ে তৎকালীন গভর্নর আলবার্ট কিককার্ট সাদা রং নিষিদ্ধ করে দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে এই রঙিন শহরকে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের নির্দশন হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে দেশটির মোট আয়তন ৪৪৪ বর্গ কিলোমিটার বা ১৭১ বর্গমাইলের বেশি।
ভাষা ও জনসংখ্যা
কুরাসাও সাধারণত বহুভাষিক সমাজের দেশ। সরকারি ভাষার নাম পাপিয়ামেন্তো। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি আর ইংরেজি মিলেমিশে তৈরি হওয়া এই ক্রেওল ভাষা দেশটির পুরো ইতিহাসের আয়না। ঔপনিবেশিক শাসন, দাস–বাণিজ্য, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের বসবাসের জন্য সবকিছুর মিলন ঘটেছে। আকর্ষণীয় বিষয় হলো—দাসদের মধ্যে একসময় একটি গোপন ভাষাও প্রচলিত ছিল, যার নাম ‘গুয়েনে’; যা মালিকেরা বুঝতেন না। সেই ভাষাও পাপিয়ামেন্তোর গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে ভাষাবিদেরা মনে করেন।
বর্তমানে দেশটিতে পঞ্চাশের বেশি জাতীয়তার মানুষ বসবাস করেন এবং অধিকাংশই অনায়াসে চার থেকে পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। পৃথিবীতে এত ছোট দেশের মধ্যে ভাষা ও জাতীয়তার বৈচিত্র্য বেশ বিরল। ওয়ার্ল্ডোমিটারের জরিপ অনুযায়ী, জনসংখ্যায় পৃথিবীতে ১৮৯তম দেশ কুরাসাও। বিবিসি ও স্কাইস্পোর্টের তথ্যে, ২০২৩ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার। অন্যদিকে দেশটির নিজস্ব পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬ জন। ধীরে ধীরে দ্বীপটির আয়তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পথে।
কুরাসাও যেভাবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি লাভ করেছে
ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মূলত দেশটি বিশ্বের দেশে দেশে পরিচিতি লাভ করেছে। তারা প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসে ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলার মধ্য দিয়ে। এর পর থেকে এই দেশটিকে নিয়ে মানুষের বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে বেশ পরিচিতি লাভ করে। সম্প্রতি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আসরে কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ অভিষেক ঘটে ৪ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে। প্রথম ম্যাচেই ৭ গোল করে ছোট্ট দ্বীপ কুরাসাওকে বিশ্বের মধ্যে আরও ভালোভাবে মনে রাখার সুযোগ করে দিয়েছে জার্মানি।
ফিফা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই যেখানে এই ছোট্ট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উৎসব; সেখানে জার্মানির বিপক্ষে একটা গোল করতে পারা পরম সৌভাগ্যের। যদি আজ থেকে ১০০ বছর পর কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপে খেলার প্রসঙ্গে ওঠ, তখন অবশ্যই মানুষের মনে থাকবে, প্রথম গোলটি কে করেছেন—উচ্চারিত হবে কোমেননসিয়ার নামটি। যা কুরাসাও নামক দেশটির জন্য বিশ্বমঞ্চে অমরত্বস্বরূপ।
তবে ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার আরও বহু আগেই কুরাসাও বিশ্ব ক্রীড়ায় নিজেদের নাম লিখিয়েছিল, কিন্তু সেটা বেসবলে। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কুরাসাও থেকে ১৭ জন মেজর লিগ বেসবল খেলোয়াড় উঠে এসেছেন সেরাদের তালিকায়।
দেশটি স্থলভাগের মতো সমুদ্রের নিচেও সমান সমৃদ্ধ। প্রায় ৪০টি সমুদ্রসৈকত আর ৬০টি ডাইভিং স্পট নিয়ে এই কুরাসাও ক্যারিবিয়ানের অন্যতম সেরা ডাইভিং গন্তব্য। এ ছাড়া এখানে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক গমন করেন দ্বীপরাষ্ট্র ও রঙিন শহর পরিদর্শনের লক্ষ্যে।
বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাব