ফিল্মের রোল থেকে মুঠোফোন, ছবির দুনিয়া বদলাল কীভাবে

পুরোনো দিনের বিভিন্ন ক্যামেরা।

একসময় ছবি তোলা ছিল বিশেষ কোনো মুহূর্তের আয়োজন। বিশেষ করে ঈদের দিন বিকেলে পরিবারের সবাই মিলে স্টুডিওতে ছবি তোলা ছিল উৎসবের একটি অংশ। বেড়াতে গেলে ক্যামেরা নিতে হবে, আর ছবি তুলতে হবে হিসাব করে। কারণ, ৩৫ মিমি ফিল্মের রোলে নির্দিষ্টসংখ্যক ছবি তোলা যেত। এখনো মনে পড়ে, সিলেট বেড়াতে গিয়ে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ছবি তুলছিলাম। শাটার টেনে ক্লিক ক্লিক সাউন্ড করে ছবি তোলার স্মৃতি এখনো বেশ স্পষ্ট। ছবি তোলা শেষ হলে সেই রোল যাবে স্টুডিওতে, এরপর ছবি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।

আজ ১৯ আগস্ট, বিশ্ব আলোকচিত্রী দিবসে চলুন জানি মুঠোফোনের ক্যামেরার গল্প।

এখন পকেটের মুঠোফোন বের করলেই ক্যামেরা প্রস্তুত।

মোবাইলে ক্যামেরার শুরু
এখন সেই অপেক্ষার দিন নেই, পকেটের মুঠোফোন বের করলেই ক্যামেরা প্রস্তুত। সামনে যা ভালো লাগছে, সেটির ছবি তুলে ফেলা যায় মুহূর্তেই। পছন্দ না হলে মুছে আবার তোলা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছবিটি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। ছবি তোলার এই সহজলভ্যতা শুধু মানুষের অভ্যাস বদলায়নি, বদলে দিয়েছে আলোকচিত্রের ধারণাটিও।

মুঠোফোনে ক্যামেরা যুক্ত হওয়ার শুরুর সময়টায় এর মান নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। প্রথম দিকের ফোন ক্যামেরায় ছবি তোলা ছিল অনেকটা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কৌতূহল। ২০০৭ সালে প্রথম আইফোনে ছিল মাত্র ২ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা।

পরবর্তী সময়ে বদলে যেতে থাকে সবকিছু। উন্নত সেন্সর, একাধিক ক্যামেরা, দ্রুতগতির প্রসেসর ও উন্নত সফটওয়্যার যুক্ত হতে থাকে ফোনে। ২০১০ সালের দিকে দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট ও উন্নত ডিসপ্লেতে অসংখ্য ছবি তোলার সুবিধা মানুষকে মোবাইল ফটোগ্রাফিতে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে ছবি তোলার জন্য আলাদা ক্যামেরা সঙ্গে রাখার প্রয়োজন কমতে থাকে।

এখন বিশেষ মুহূর্তের ছবি, ভ্রমণের দৃশ্য, খাবারের ছবি, সন্তানের প্রথম হাঁটা, বৃষ্টির মুহূর্ত, রাস্তার কোনো অদ্ভুত দৃশ্য—সবই মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী হচ্ছে। ছবি তোলার সুযোগ যেন এখন আর বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষা করে না; বরং মুহূর্তটি চোখে পড়লেই ছবি হয়ে যাচ্ছে।

টুইন-লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা

উন্নত সফটওয়্যার ক্যামেরাকে করেছে আরও আধুনিক
মুঠোফোনের ক্যামেরার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু লেন্স বা মেগাপিক্সেলে নয়; পরিবর্তন ঘটেছে ছবির পেছনের প্রযুক্তিতেও।

আপনি যখন ফোনের ক্যামেরার শাটার চাপেন, তখন শুধু একটি ছবি তোলা হয় না; বরং একই সঙ্গে একাধিক ফ্রেম দ্রুত ধারণ করে সেগুলো বিশ্লেষণ ও একত্র করে একটি ছবি তৈরি করে। সেখানে থাকে আলো-আঁধারির পার্থক্য সামলানো, ছবির নয়েজ কমানো, উজ্জ্বল ও অন্ধকার অংশের বিস্তারিত ধরে রাখা, এমনকি দূরের বিষয়কে আরও স্পষ্ট দেখানোর ক্ষেত্রেও সফটওয়্যার বড় ভূমিকা রাখে। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি।

এ কারণেই এখন ছোট সেন্সরের একটি মুঠোফোনও এমন ছবি তৈরি করতে পারে, যা কয়েক বছর আগেও তুলতে আলাদা ক্যামেরা, বড় লেন্স কিংবা দক্ষ ফটোগ্রাফারের প্রয়োজন হতো।
বিশেষ করে রাতের ছবি এর ভালো উদাহরণ। ফোন কয়েকটি ফ্রেম ধারণ করে সেগুলো মিলিয়ে তুলনামূলক উজ্জ্বল ও কম নয়েজের ছবি তৈরি করতে পারে। ফলে অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও আগের তুলনায় অনেক ভালো ছবি তুলতে পারেন।

পুরোনো দিনের ক্যামেরা
ছবি: আশরাফুল আলম

ছবি তোলার সহজলভ্যতা
মুঠোফোনের ক্যামেরার সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই—ছবি তোলা এখন খুব সহজ। আগে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা কেনা, সেটি ব্যবহার শেখা কিংবা ফটোগ্রাফারের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এখন কয়েক হাজার টাকার স্মার্টফোনেও ক্যামেরা থাকে। ফলে বয়স, পেশা বা আলোকচিত্রের প্রশিক্ষণ—কোনোটিই ছবি তোলার পথে বড় বাধা নয়। ক্যামেরা অন করো, আর ক্লিক করো। যেকোনো বয়সের মানুষই ছবি তুলতে পারছে। একটি গবেষণাধর্মী পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মোবাইল ক্যামেরা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবি ধারণ, সম্পাদনা, সংরক্ষণ ও শেয়ার করার পদ্ধতিই বদলে গেছে। ২০১৭ সালেই বিশ্বের ধারণ করা ছবির বড় অংশ স্মার্টফোনে তোলা হয়েছিল বলে সে সময়ের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, ছবি এখন শুধু স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম নয়; এটি দৈনন্দিন যোগাযোগের ভাষাও। কেউ কোনো জায়গায় বেড়াতে গিয়ে শুধু বলেন না, ‘জায়গাটা সুন্দর’, ছবি তুলে সবার সঙ্গে শেয়ারও করেন। কেউ খাবার খেয়ে শুধু বলেন না, ‘খাবারটা ভালো’, খাবারের ছবিই হয়ে ওঠে তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ। এখন দিনের কোনো ঘটনা চোখের সামনে ঘটলে প্রথম সাক্ষী অনেক সময় একজন সাংবাদিক নন, একজন সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। আধুনিক স্মার্টফোন ক্যামেরা সাংবাদিকতাকেও সহজ করেছে।

আরও পড়ুন
পেশাদার আলোকচিত্রে এখনো বড় সেন্সর, বিনিময়যোগ্য লেন্স, দীর্ঘ ফোকাল দৈর্ঘ্য, নির্দিষ্ট আলো নিয়ন্ত্রণ এবং র ফাইলের মতো সুবিধার প্রয়োজন হয়
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

বদলে গেছে ফটোগ্রাফারের কাজ
মুঠোফোনের ক্যামেরার উন্নতি পেশাদার ফটোগ্রাফারদের কাজকেও প্রভাবিত করেছে। তবে স্মার্টফোন পেশাদার ক্যামেরাকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়নি; বরং বদলে দিয়েছে কাজের ধরন।

সাধারণ দৈনন্দিন ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট কিংবা দ্রুত কোনো ঘটনা ধারণের ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের সুবিধা অনেক। মুঠোফোন ক্যামেরাটি সব সময় সঙ্গে থাকে, ছবি তোলার পরপরই সম্পাদনা ও পাঠানো যায়।

কিন্তু পেশাদার আলোকচিত্রে এখনো বড় সেন্সর, বিনিময়যোগ্য লেন্স, দীর্ঘ ফোকাল দৈর্ঘ্য, নির্দিষ্ট আলো নিয়ন্ত্রণ এবং র ফাইলের মতো সুবিধার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে সংবাদ, বন্য প্রাণী, ক্রীড়া, বিজ্ঞাপন কিংবা উচ্চ মানের বাণিজ্যিক কাজে পেশাদার ক্যামেরার সুবিধা আলাদা। আধুনিক স্মার্টফোনের উন্নতি সত্ত্বেও বড় সেন্সর ও বড় অপটিকসের কিছু মৌলিক সুবিধা পদার্থবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় না। তবে ফটোগ্রাফারের কাছে স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কোনো জায়গায় গিয়ে বড় ক্যামেরা বের করার সুযোগ নেই? ফোন দিয়েই মুহূর্তটি ধরে রাখা যায়। কোনো দৃশ্যের দ্রুত রেফারেন্স দরকার? ফোনই যথেষ্ট। ভিডিও, ছবি, রেকর্ডিং, সম্পাদনা ও প্রকাশ—সব এক যন্ত্রে করা যায়।

আগে প্রশ্ন ছিল—ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল? এখন সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—ক্যামেরার এআই ফিচার কতটা উন্নত?
ছবি: রয়টার্স

ক্যামেরা প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
একসময় মোবাইল ক্যামেরার বিজ্ঞাপনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ‘কত মেগাপিক্সেল’। এখন সেই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে অন্য বিষয়—ফোন ছবি তোলার পর কী করতে পারে। এইচডিআর, নাইট মোড, পোর্ট্রেট মোড, সুপার-রেজোল্যুশন, স্বয়ংক্রিয় দৃশ্য শনাক্তকরণসহ নানা প্রযুক্তি ছবিকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে উন্নত করছে। আধুনিক কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফিতে মেশিন লার্নিংও যুক্ত হয়েছে। ফলে এখন একটি ছবি তৈরির কাজ শুধু লেন্সের ভেতর দিয়ে আলো প্রবেশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শাটার চাপার পর ফোনের ভেতরের প্রসেসর ও সফটওয়্যারও ছবির নির্মাণে অংশ নেয়। ফলে খুব সহজেই ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন করা যায়, কালার গ্রেডিং করা যায়। অর্থাৎ, আগে ফটোশপে যে কাজ অনেক সময় লাগত, তা কয়েক সেকেন্ডেই করা যাচ্ছে। এই জায়গাতেই বদলে গেছে আলোকচিত্রের পুরোনো ধারণা। আগে প্রশ্ন ছিল—ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল? এখন সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—ক্যামেরার এআই ফিচার কতটা উন্নত?

একসময় ভালো ছবি তুলতে ভালো ক্যামেরা দরকার ছিল। এখন ভালো ক্যামেরা প্রায় সবার হাতেই। তবে ভালো ছবি শুধু ভালো ক্যামেরার ফল নয়; বরং একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও। মুঠোফোনের ক্যামেরা ফটোগ্রাফিকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। ছবি তোলার খরচ কমিয়েছে, সময় কমিয়েছে, প্রযুক্তিগত বাধা কমিয়েছে। কিন্তু আলোকচিত্রের সবচেয়ে পুরোনো সত্যটি বদলায়নি—ক্যামেরা ছবি তোলে, কিন্তু ছবি তৈরি করে মানুষের চোখ। আগে ভালো ছবি তুলতে ক্যামেরার পেছনে একজন মানুষ লাগত। এখন মানুষের হাতে ক্যামেরা। তাই বদলে যাওয়া গল্পটি আসলে শুধু ক্যামেরার নয়; ছবি দেখার চোখেরও।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা