বুড়িগঙ্গার পাড়ে লালকুঠি, ইতিহাসের এক লালচে অধ্যায়
রিকশা, ভ্যান, পথচারী আর নৌযাত্রীর ভিড় পেরিয়ে পুরান ঢাকার সদরঘাটে পৌঁছাতেই দেখা মিলবে লালচে পুরোনো এক ভবন। পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক ভবন নর্থব্রুক হল নামেও পরিচিত। তৎকালীন বাংলার গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ভবনের লালচে রং ও লাল ইটের কারণেই মানুষের মুখে মুখে এটি ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে নামের গল্পের চেয়েও আকর্ষণীয় এর ভেতরের ইতিহাস।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকা যখন ধীরে ধীরে একটি আধুনিক নগরজীবনের দিকে এগোয়, ঠিক তখনই প্রয়োজন ছিল এমন কিছু জায়গার, যেখানে মানুষ সভা করবে, নাটক দেখবে, সাংস্কৃতিক আয়োজন করবে। সেই সময়েই নর্থব্রুক হল হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল। এর ঠিক পাশেই ছিল সদরঘাট। ঢাকার ব্যস্ত নদীবন্দর। ফলে নদী, বাণিজ্য আর সংস্কৃতি— তিনটি ভিন্ন স্রোত এসে মিলে যায় এক জায়গায়।
আজকের লালকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে অতীতকে দেখা যায় না, শুধু কল্পনা করা যায়। হয়তো কোনো এক বিকেলে এই হলঘরেই জমেছিল মানুষের ভিড়, কোথাও চলছিল সভা, কোথাও সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাইরে সদরঘাটের কোলাহল, আর ভেতরে মানুষের কথা ও করতালির শব্দ—এই দুই জগৎ একই সঙ্গে চলত। ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে তাদের সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে।
সময় বদলেছে। সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। তবু লালকুঠির প্রতি মানুষের কৌতূহল কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে পুরোনো স্থাপত্য ও পুরান ঢাকার আবহ নতুন করে লালকুঠির দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করছে। অনেকেই এখন লালকুঠিতে আসেন ছবি তুলতে, পুরোনো দিনের স্থাপত্যকে ক্যামেরায় ধরে রাখতে কিংবা শহরের চেনা ব্যস্ততার বাইরে একটু অন্য রকম পরিবেশ খুঁজতে। লালকুঠির পুরোনো লালচে দেয়াল, দরজা, স্থাপত্যের খুঁটিনাটি কিংবা আশপাশের পুরান ঢাকার পরিবেশ অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে আলাদা এক ব্যাকড্রপ।
লালকুঠি দেখতে চাইলে যেতে হবে পুরান ঢাকার সদরঘাট। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস, রিকশা কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে সদরঘাটে যাওয়া যায়। সদরঘাট এলাকায় পৌঁছে স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে লালকুঠি বা লালকুঠির ঘাট বললে পথ চিনে নেওয়া অনেকটা সহজ। ভবনে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট টিকিটের প্রয়োজন নেই। তবে পুরান ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা ও যানজটের কথা মাথায় রেখে হাতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় রাখা ভালো। আর যদি ছবি তোলার উদ্দেশ্যে যান, তাহলে শুধু ভবনটি নয়; পাশাপাশি সদরঘাট, বুড়িগঙ্গা আর আশপাশের পুরোনো নগরদৃশ্যকেও ফ্রেমে রাখলে অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর হবে।
পুরান ঢাকার বহু স্থাপনার মতো এটিও ঘনবসতি, যানজট, দূষণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার মধ্যে রয়েছে। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে এটিকে গবেষণা, প্রদর্শনী, নাট্যচর্চা ও নগর-ইতিহাস শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। লালকুঠির আগের সাংস্কৃতিক মঞ্চ এখন আর নেই। তবু মানুষ এখানে আসে ইতিহাসের খোঁজে। এভাবেই বুড়িগঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লালকুঠি হয়ে উঠেছে পুরোনো শহরের স্মৃতি আর আজকের ঢাকার ব্যস্ততার এক পরিচিত ঠিকানা।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়