গল্পের খোঁজে যখন গন্তব্য থাকে পাহাড়, তখন গন্তব্যের চেয়ে পথই হয়ে ওঠে বড় বিস্ময়। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে থাকা সাদা মেঘ আর দূরের পাহাড়। প্রতিটি মুহূর্তই মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি যেন নতুন করে নিজেকে মেলে ধরেছে। সাজেকের সৌন্দর্যের সবচেয়ে উঁচু অধ্যায় লেখা আছে কংলাক পাহাড়ে। সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া ও সর্বশেষ গ্রাম। এখানে পৌঁছালে মনে হয়, আকাশ আর পাহাড়ের দূরত্ব যেন একেবারেই মুছে গেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা কংলাক পাহাড় প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অপার বিস্ময়ের নাম। চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। সবুজ পাহাড়ের সারি, গভীর অরণ্য আর দূরে ভারতের মিজোরামের পাহাড়শ্রেণি। মেঘ কখনো পায়ের নিচে, কখনো আবার চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। মুহূর্তেই বদলে যায় প্রকৃতির রং, আলো আর আবহ। পাহাড়ের চূড়াতেই ছোট্ট কংলাক পাড়া। এখানে বসবাস করে লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের বাঁশ-কাঠের ঘর, সহজ-সরল জীবনযাপন, অতিথিপরায়ণতা ও পাহাড়ি সংস্কৃতি কংলাককে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়। আধুনিকতার স্পর্শ এলেও এ গ্রাম এখনো ধরে রেখেছে নিজস্ব ঐতিহ্য আর প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।
কয়েক বছর আগেও কংলাকে ওঠা ছিল সাহসিকতার বিষয়। রুইলুই পাড়া থেকে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত ছিল কাদামাটির সরু ও খাড়া পথ। বর্ষার দিনে সে পথ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠত। এখন সে চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নে তৈরি হয়েছে পিচঢালা ও ইটের রাস্তা। চাঁদের গাড়ি, জিপ কিংবা মোটরবাইকে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় পাহাড়ের নিচে। এরপর সিমেন্টের সিঁড়ি আর নিরাপত্তাবেষ্টিত রেলিং ধরে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে হয়। পথটি এখন অনেক সহজ হলেও পাহাড়ের সৌন্দর্য একটুও কমেনি। কংলাকে পৌঁছানোর পথটিও ভ্রমণের আনন্দেরই অংশ।
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে যেতে হবে খাগড়াছড়িতে। সেখানকার শাপলা চত্বর থেকে প্রতিদিন চাঁদের গাড়ি ছেড়ে যায় দীঘিনালা হয়ে সাজেকের পথে। সাজেকের রুইলুই পাড়া কিংবা হেলিপ্যাড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কংলাক পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানো যায় গাড়ি বা মোটরবাইকে। এরপর ২০ থেকে ৩০ মিনিট সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই মেঘের রাজ্যে প্রবেশের অনুভূতি।
ভোরের সূর্যোদয় আর বিকেলের সূর্যাস্ত দেখার জন্য সাজেকের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থানগুলোর একটি কংলাক পাহাড়। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ার দৃশ্য যেমন মন ছুঁয়ে যায়, তেমনি গোধূলির শেষ আলোয় পাহাড়গুলো যেন সোনালি রঙে রাঙিয়ে ওঠে। বর্ষাকালে মেঘের আনাগোনা আর শীতে নির্মল আকাশ। দুই ঋতুতেই কংলাকের রূপ ভিন্ন অথচ মুগ্ধতা সমান।
পাহাড়ের ঢালে স্থানীয় অধিবাসীদের জুম চাষ চোখে পড়ে। হলুদ, আদা, কমলা ও নানা ফসলের ছোট ছোট খেত পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এখানকার কমলা বিশেষভাবে পরিচিত। কংলাকে ঘুরতে গিয়ে আরেকটি বিষয় সহজেই নজরে আসে—ছোট আকারের দেশি পাহাড়ি কুকুর। শান্ত, নিরীহ আর মানুষের প্রতি ভীষণ বন্ধুসুলভ কুকুরগুলো প্রায়ই পর্যটকদের সঙ্গে পাহাড়ে ওঠানামা করে। অনেক ভ্রমণকারীর কাছে তারা যেন কংলাকের নীরব পথপ্রদর্শক।
কংলাক প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। এখানে এসে বোঝা যায়, পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু তার উচ্চতায় নয়, বরং মানুষ, জীবনযাপন, নীরবতা আর মেঘের সঙ্গে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্কেও লুকিয়ে আছে। তাই নাগরিক ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে গিয়ে যদি প্রকৃতির নির্মল স্পর্শ অনুভব করতে চান, তবে কংলাক পাহাড় আপনাকে নিরাশ করবে না। ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন একটুকরো মেঘ আর আজীবন মনে রাখার মতো অসংখ্য স্মৃতি।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়