বাবা, যতটা জানেন তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

প্রিয় বাবা,

বিধাতার অসীম কৃপাবলে আশা করি সুস্থ দেহে আছেন। আপনাকে চিঠি লিখতে বসে উপলব্ধি করছি, কিছু অনুভূতিকে শব্দমালায় রূপ দেওয়া অসম্ভব। যেমন স্পর্শাতীত ভোরের হিমকণার শুভ্রতা, কিংবা গোধূলির অন্তিম আলোকচ্ছটার মায়া; আপনিও ঠিক তেমনই। আমার জীবনের প্রতিটি পরিচ্ছেদে আপনার ব্যাপ্তি, অথচ এই অনন্য ত্যাগকে কোনো ভাষায় বাঁধা সম্ভব নয়।

আপনি তো জানেনই–না বাবা দিবস কী। মাত্র সাত-আট বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়া আপনাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা। শৈশবের সেই অল্প বয়স থেকে জীবনযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে তীব্র সংগ্রাম আর সততার নিশান উড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আপনি আমার একমাত্র হিরো, আমার শ্রেষ্ঠ আইডল। আপনার সততা, নিষ্ঠা আর অক্লান্ত পরিশ্রম আমাদের সুখের বীজ।

প্রিয় বাবা, আপনার কি মনে আছে? শৈশবে হাটে যাওয়ার জন্য আমি আপনার পিছু ধরে কতটা জেদ করতাম। আপনি কখনো সস্নেহে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, কখনো আমায় ফাঁকি দিয়ে প্রস্থান করতেন। তবে হাট থেকে ফেরার পথে আমার প্রিয় নাশতা কিংবা মিষ্টি পাউরুটি আনতে ভুলতেন না। একদিন আমার অত্যধিক জেদের কারণে আপনি সামান্য শাসন করেছিলেন, আর তাতেই আমি তিন দিন জ্বরে ভুগেছিলাম; তারপর থেকে আপনি আর কখনো আমার গায়ে হাত তোলেননি। বরং মায়ের কঠোর বকুনির সামনে সব সময় পরম ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

আরও পড়ুন

দিনের সব ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যায় সবাই যখন আড্ডায় মগ্ন হতো, তখন আপনি আমায় সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে যেতেন বংকো স্যারের প্রাইভেটে। আঁধার নামতেই গ্রামীণ জনপদ যখন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ত, তখন আমি ঝিঁঝি পোকার তান, জোনাকির মেলা আর জ্যোৎস্নালোকে তারার মতো প্রস্ফুটিত কদম ফুলের শোভা দর্শন করতে করতে আপনার সঙ্গে গৃহপানে ফিরতাম। পড়া শেষে মাঝরাতে ক্ষুধা লাগবে বলে আপনার খাবার থেকে অর্ধেক রেখে দিতেন আমার জন্য। আপনার অবিচল সহযোগিতা ও ক্লান্তিহীন শ্রমের পরশেই এই নিভৃত পল্লি থেকে উঠে এসে আজ আমি স্থান করে নিয়েছি দেশের শ্রেষ্ঠ এক বিদ্যাপীঠে।

বাবা, এখন আমি একাকী পথ চলতে শিখে গেছি। তবে আপনার জোরে কথা বলা এখনো সহ্য করতে শিখিনি। জীবনের এই বন্ধুর পথে যত দূরই যাই, দিনাবসানে আমি আপনার সেই ছোট্ট আদুরে শিশুটিই রয়ে যেতে চাই—যে সাইকেলের পেছনে চড়ে অবাধ্য বাতাসে চুল ওড়াবে, এটা-সেটা বায়না করবে, আবার বাবার অসুস্থতায় সবার আগে শিয়রে বসবে জলপট্টি দিতে। আমি আপনাকে আজীবন ঠিক ততটাই প্রফুল্ল দেখতে চাই, যতটা আনন্দিত হয়েছিলেন তিন পুত্রের পর আমার এই ধরণিতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার শুভক্ষণে। যে কথাটা আপনাকে কোনো দিনও বলা হয়নি তা আজ বলতে চাই—যতটা জানেন, আপনাকে তার চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি বাবা।

ইতি,
আপনার স্নেহের তনয়া