সময় এবং আমার আব্বা

বাবা ও সন্তানের সঙ্গেছবি: লেখকের সৌজন্যে

আব্বার পেশা ছিল ব্যবসা। ঘড়ির ব্যবসা করতেন। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে তাঁর বহু পুরোনো ঘড়ির প্রতিষ্ঠান ‘শওকত ওয়াচ কোং’–এর অবস্থান ছিল। ডাক সাইটে হোলসেল ঘড়ি ব্যবসায়ী হিসেবে তখন পুরো বাংলাদেশ তাঁকে চিনত। ‘সময়ের পরিমাপক যন্ত্র ব্যবসায়ীর ছেলে’ শৈশবের বন্ধুদের কাছ থেকে এই উপাধি তত দিনে পাওয়া হয়ে গেছে আমার। একটু একটু করে জীবনকে অনুভবের শুরুতেই বুঝে গিয়েছি সময় মানুষের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সময়ের অনুষঙ্গের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আমার আব্বা শওকত আলী যে সময়ের থেকে এগোনো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, তা বুঝতে আমার অনেক দিন সময় লেগেছে।

পরিবারের সদস্যরা

জীবনের প্রয়োজনে যদিও তাঁকে প্রচণ্ড ব্যস্ত থেকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হতো; কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত তাঁর বাবা অর্থাৎ আমার দাদা ওয়াহেদ আলীর ভালোবাসার প্রতি। সেই ভালোবাসা ছিল ‘যাত্রা’। আমার দাদা যাত্রায় নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। এটাই তাঁর পেশা ছিল। পেশাদার যাত্রাশিল্পী ওয়াহেদ আলীর ছেলে শওকত আলীর নেশা ছিল অভিনয়। মঞ্চ, টেলিভিশন, সিনেমা—সব মাধ্যমেই তাঁর ছিল চরম আগ্রহ ও ভালোবাসা। সুযোগ পেলেই যেকোনো সময়ই যেকোনো অভিনয়েই বুঁদ হয়ে পড়তেন তিনি।

বাবা ও সন্তানদের সঙ্গে

আব্বার মঞ্চে অভিনয়ের দিনগুলো স্পষ্টতই আমি আলাদা করতে পারতাম। সাধারণ অন্যান্য দিনগুলোর তুলনায় মঞ্চের শোর দিন আব্বার সারা দিনের আয়োজনই থাকত একদম আলাদা। কোনো বড় অভিনেতার জীবনকাহিনি পড়ে বা ডকুমেন্টারি দেখে নয়, বরং আমার সাধারণ ব্যবসায়ী আব্বাকে দেখেই আমি প্রথম একজন অভিনেতার প্রস্তুতির ধারণা পাই শৈশবে। অন্য কোনো দিনের থেকে মঞ্চের শোর দিনটা যে একজন অভিনেতার জন্য আলাদা, তা প্রথম আব্বাকে দেখেই শিখি। তাঁর দিন শুরু হতো ফ্রি হ্যান্ড কিছু ব্যয়াম দিয়ে। খুব ভারী কোনো খাবার সারা দিনে খেতেন না, চেষ্টা করতেন শোর দিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য কারও ওপর দিতে, তা যদি না পারতেন, সেদিন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসতেন। নিজের মতো করে ভোকাল এক্সারসাইজ, কনসেনট্রেশন, বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে গার্গাল করতেন। কারও সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথা বলতেন না। অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা, রাগারাগি এড়িয়ে চলতেন।

শৈশবে বাবা–মায়ের সঙ্গে

স্কুলপড়ুয়া আমি সেই বয়সেই বুঝতাম শোর দিনটা ওনার কাছে কতটা বিশেষ। ব্যবসায়ী হিসেবে ভীষণ ব্যস্ত আমার আব্বা অভিনয়ের জন্য আলাদা করে সময় বের করতেন। সেই সব অভিনয় দিনের পর দিন মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আমরা। পরে যখন আমি নিজে অভিনয় করতে শুরু করি, তখন উনি আমাকে কোনো বাধা তো দিতেন না, বরং আমি যেন আমার কাজ সুন্দরভাবে করতে পারি, তার জন্য যা প্রয়োজন, উনি সর্বোচ্চ সহযোগিতা আমাকে করেছেন। সময়ের আগে চিন্তা করতে পেরেছিলেন বলেই সন্তানকে তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য সব সময় সবকিছু করেছেন তিনি। আমার আব্বা না থাকলে একজন ক্ষুদ্র অভিনেতা হিসেবে যে চেষ্টা আজ আমি করছি, কোনো দিন তা সম্ভব হতো না। আমি আমার প্রতিটি কাজের মধ্যেই আব্বাকে প্রতিনিয়ত অনুভব করি।

লেখক: অভিনয়শিল্পী