কোকো, কফি আর ফুটবলের বাইরেও আইভরিকোস্ট কেন বিখ্যাত

আইভরিকোস্টের অন্যতম পর্যটন স্থান ইয়ামুসুক্রোর বিশাল ব্যাসিলিকাছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে গিনি উপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি দেশ, যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোকো, কফি আর সবুজ বনভূমির ছবি। তবে আইভরিকোস্ট—সরকারি নাম কোটা ডি আইভরি (Côte d'Ivoire)—শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকো উৎপাদনকারী দেশই নয়; এটি এখন পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এবং ফরাসিভাষী আফ্রিকার প্রভাবশালী রাষ্ট্র। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কঠিন সময় পেরিয়ে দেশটি এখন শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করছে।

কোনো দেশের পরিচয় শুধু তার অর্থনীতি বা রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের ভাষা, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক জীবন ও ইতিহাসই একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় নির্মাণ করে। সেই দিক থেকে আইভরিকোস্ট পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় দেশগুলোর একটি। ষাটের বেশি জাতিগোষ্ঠী, অসংখ্য স্থানীয় ভাষা, মুসলিম, খ্রিষ্টান ও স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সহাবস্থান এবং আফ্রিকান ও ফরাসি ঐতিহ্যের মিশেলে গড়ে উঠেছে দেশটির স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।

পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনীতির কথা উঠলেই আইভরিকোস্টের নাম উচ্চারিত হয় প্রথম সারিতেই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোকো উৎপাদনের পাশাপাশি কফি, কাজুবাদাম, রাবার ও পাম তেল উৎপাদনেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কৃষির পাশাপাশি ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর, দ্রুত বিকাশমান শিল্প, আর্থিক খাত এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দেশটি আজ আফ্রিকার অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। একই সঙ্গে ফুটবলও দেশটির জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ; দিদিয়ের দ্রগবা ও ইয়ায়া তুরেদের মতো তারকারা আইভরিকোস্টকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছেন।

অবশ্য উন্নয়নের এই যাত্রা একেবারেই বাধাহীন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বন উজাড়, বৈদেশিক ঋণের চাপ, যুববেকারত্ব, আয়বৈষম্য এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো নানা চ্যালেঞ্জ এখনো দেশটির সামনে বড় বাস্তবতা। তবু কৃষি, মানবসম্পদ, শিল্প, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে আইভরিকোস্ট যে নতুন এক সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তা আজ আফ্রিকার উন্নয়নের অন্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প। বিশ্বকাপের এই আয়োজনে ফুটবলের বাইরেও আমরা জানব কোকোর সুবাসে গড়ে ওঠা পশ্চিম আফ্রিকার এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার নানা অনালোচিত দিক।

আইভরিকোস্টের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা দিদিয়ে দ্রগবা।

আফ্রিকার হৃদয়ে এক বৈচিত্র্যময় দেশ
আইভরিকোস্টের পশ্চিমে লাইবেরিয়া ও গিনি, উত্তরে মালি ও বুরকিনা ফাসো, পূর্বে ঘানা এবং দক্ষিণে গিনি উপসাগর। প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার ৪৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণের বেশি বড়।

দেশটির রাজনৈতিক রাজধানী ‘ইয়ামুসুক্রো’; তবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্প, ব্যাংকিং ও কূটনীতির কেন্দ্র ‘আবিদজান’। একে ‘পশ্চিম আফ্রিকার প্যারিস’ বলা হয়। সুউচ্চ ভবন, আধুনিক সেতু, ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাকেন্দ্রের কারণে আবিদজান পুরো অঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত নগরী।

বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এই দেশে, যা আইভরিকোস্টকে আফ্রিকার অন্যতম বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

বন, নদী ও কৃষির দেশ
আইভরিকোস্টের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে রয়েছে ঘন উষ্ণমণ্ডলীয় বনভূমি। মধ্যাঞ্চলে সাভানা এবং উত্তরে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক তৃণভূমি।

দেশটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বান্দামা, কোমোয়ে, সাসান্দ্রা ও কাভালি নদী। যদিও নদীগুলো বড়, তবু অধিকাংশই নৌপরিবহনের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়।

আবহাওয়া মূলত উষ্ণমণ্ডলীয়। দক্ষিণে বছরে দুটি বর্ষা মৌসুম থাকলেও উত্তরে একটি দীর্ঘ বর্ষাকাল ও একটি শুষ্ক মৌসুম দেখা যায়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এই জলবায়ু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাতির দাঁতের উপকূল
আইভরিকোস্ট নামটির পেছনেও রয়েছে ইতিহাস। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা একসময় পশ্চিম আফ্রিকার এ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ হাতির দাঁত সংগ্রহ করতেন। সে কারণেই অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় Ivory Coast বা হাতির দাঁতের উপকূল।
১৯৮৫ সালে দেশটির সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি নাম Côte d'Ivoire ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন এই নামই ব্যবহার করে।

আইভরিকোস্টের অন্যতম পর্যটন স্থান তাই জাতীয় উদ্যান
ছবি: সংগৃহীত

ফরাসি উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা
উনিশ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্স আইভরিকোস্টকে উপনিবেশে পরিণত করে। ১৮৯৩ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি উপনিবেশ ঘোষিত হয়।

ফরাসিরা দেশটিতে সড়ক, রেলপথ ও বন্দর নির্মাণ করলেও এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিপণ্য ইউরোপে রপ্তানি করা। স্থানীয় জনগণের শ্রম ও ভূমি ব্যবহার করে গড়ে ওঠে কফি ও কোকোর বিশাল বাগান।

দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট। দেশটির স্বাধীনতার স্থপতি ছিলেন ফেলিক্স উফুয়ে-বোয়নি, যিনি স্বাধীনতার পর টানা ৩৩ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর সময়েই আইভরিকোস্ট আফ্রিকার দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। ইতিহাসে এই সময়কে অনেকেই ‘আইভরিয়ান অর্থনৈতিক অলৌকিকতা’ বলে অভিহিত করেন।

সংকট থেকে পুনরুত্থান
স্বাধীনতার পর কয়েক দশক স্থিতিশীল থাকলেও ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়ে। ২০০২ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। দেশটি কার্যত উত্তর ও দক্ষিণ—দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

২০১০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মাসের সংঘর্ষে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন। তবে গত এক দশকে দেশটি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে অর্থনীতি আবারও গতিশীল হয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থা
আইভরিকোস্ট একটি একক (Unitary) রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র।
রাষ্ট্রপতিই রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। তিনি মন্ত্রিসভা নিয়োগ করেন এবং নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান।
দেশটির জাতীয় সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিচারব্যবস্থা সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীন হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিচার বিভাগের আরও কার্যকর স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থা
প্রশাসনিক সুবিধার জন্য আইভরিকোস্টকে একাধিক স্তরে ভাগ করা হয়েছে।
দেশটি ১৪টি জেলা, ৩১টি অঞ্চল, ১০৮টি বিভাগ, উপবিভাগ এবং শতাধিক কমিউনে বিভক্ত।
নির্বাচিত মেয়র ও স্থানীয় পরিষদ শহর ও পৌর এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব এখনো স্থানীয় প্রশাসনে যথেষ্ট শক্তিশালী।

সড়ক, প্রাথমিক শিক্ষা, স্থানীয় বাজার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর উন্নয়নের মতো অনেক দায়িত্ব স্থানীয় সরকার পালন করে।

বেশ কয়েকবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস শিরোপা জিতেছে আইভরিকোস্ট ফুটবল দল।

রাজনীতি
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় একদলীয় শাসন চললেও বর্তমানে দেশটিতে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
স্বাধীনতার কিছুদিন পরই ১৯৬০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আইভরিকোস্ট জাতিসংঘের ৯৯তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সদস্যপদ লাভ করে। এ ছাড়া দেশটি আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ), পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট, পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক ও মুদ্রা ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য।

পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আইভরিকোস্টের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে আবিদজান এখন এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র।

জনসংখ্যা: বৈচিত্র্যের এক আবাস
আইভরিকোস্টের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। স্বাধীনতার সময় এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ লাখের মতো। কয়েক দশকে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি। বুরকিনা ফাসো, মালি, গিনি, ঘানাসহ প্রতিবেশী দেশ থেকে কয়েক মিলিয়ন মানুষ কাজের সন্ধানে আইভরিকোস্টে এসেছেন। ফলে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বহুজাতিক সমাজে পরিণত হয়েছে দেশটি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। আফ্রিকার অন্য কোনো বড় অর্থনীতিতে এত বেশি অভিবাসীর উপস্থিতি খুব কমই দেখা যায়।

বর্তমানে জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি শহরে বসবাস করে। রাজধানী ইয়ামুসুক্রোর চেয়ে আবিদজান অনেক বড় এবং জনবহুল। প্রায় ৭০ লাখ মানুষের এই মহানগর পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম ব্যস্ত নগরী।

শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর দেশ
আইভরিকোস্টে ৬০টির বেশি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তবে বৃহত্তরভাবে এগুলোকে চারটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়—আকান, ক্রু, ম্যান্ডে, ও ভোলটাইক বা গুর। প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, নৃত্য, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই দেশটির সাংস্কৃতিক শক্তি।

আইভরিকোস্টের অন্যতম পর্যটন স্থান কোমোয়ে জাতীয় উদ্যান
ছবি: সংগৃহীত

ভাষা
আইভরিকোস্টের সরকারি ভাষা ফরাসি। প্রশাসন, শিক্ষা, আদালত, ব্যবসা ও গণমাধ্যমে ফরাসি ভাষাই ব্যবহৃত হয়। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশটিতে ৭০টির বেশি স্থানীয় ভাষা প্রচলিত। এর মধ্যে বাউলে, দিউলা, বেতে, সেনুফো ও আগনি উল্লেখযোগ্য।

দিউলা ভাষা অনেক এলাকায় বাণিজ্যিক যোগাযোগের ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফরাসি ভাষা দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করেছে।

শিক্ষা
স্বাধীনতার পর থেকেই শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্ব দিয়েছে আইভরিকোস্ট। তবে রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধের কারণে দীর্ঘ সময় শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানে সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। দেশটির সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশের কিছু বেশি। পুরুষদের সাক্ষরতার হার নারীদের তুলনায় বেশি হলেও নারীশিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে।

আবিদজানের ফেলিক্স উফুয়ে-বোয়নি বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বহু বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি কলেজ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি গবেষণা ও শিল্প প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

ধর্ম
আইভরিকোস্ট ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, প্রায় ৩৫ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং বাকিরা স্থানীয় আফ্রিকান ধর্ম বা অন্যান্য বিশ্বাস অনুসরণ করেন। উত্তরাঞ্চলে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি, আর দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিষ্টানদের প্রাধান্য।

ধর্মীয় বৈচিত্র্য থাকলেও সাধারণভাবে দেশটিতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। ঈদ, বড়দিন ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব জাতীয় জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

সভ্যতা
ঔপনিবেশিক যুগের অনেক আগে থেকেই আইভরিকোস্ট অঞ্চলে শক্তিশালী আফ্রিকান রাজ্য ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। স্বর্ণ, হাতির দাঁত ও কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফরাসি উপনিবেশিক শাসন প্রশাসনিক কাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলেও স্থানীয় ঐতিহ্য পুরোপুরি বিলীন হয়নি। আজও গ্রামীণ সমাজে প্রথাগত নেতৃত্ব, প্রবীণদের পরামর্শ এবং স্থানীয় সামাজিক রীতিনীতির গুরুত্ব রয়েছে।

আইভরিকোস্টে ফুটবল হলো জাতীয় আবেগ। দেশটির জাতীয় দল দ্য এলিফ্যান্টস নামে পরিচিত।

সামাজিক সংস্কৃতি
আইভরিকোস্টের সমাজে পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, আত্মীয়তার বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সামাজিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি। গ্রামীণ এলাকায় এখনো অনেক মানুষ সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনযাপন করেন। কৃষিকাজ, উৎসব কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান—সবই সম্মিলিতভাবে সম্পন্ন হয়। নারীদের ভূমিকা কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পরিবার পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সংগীত ও নৃত্য
আইভরিকোস্টের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম অংশ সংগীত। দেশটির জনপ্রিয় সংগীতধারার মধ্যে রয়েছে জুগলু (Zouglou), কুপে-দেকালে (Coup-Décal) এবং বিভিন্ন লোকসংগীত। বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী আলফা ব্লন্ডি আইভরিকোস্টের অন্যতম সাংস্কৃতিক দূত। তাঁর রেগে সংগীত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির পরিচিতি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নৃত্য, মুখোশ উৎসব এবং বাদ্যযন্ত্রও দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

সাহিত্য ও শিল্প
আইভরিকোস্টে ফরাসি ভাষায় সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। উপন্যাস, কবিতা ও নাটকে ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতা, জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। কাঠ খোদাই, মুখোশ, ব্রোঞ্জশিল্প ও বস্ত্রশিল্পও দেশটির ঐতিহ্যবাহী শিল্পের অংশ। বিশেষ করে কাঠের মুখোশ তো শিল্পকর্মই নয়; অনেক জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

উৎসব
স্বাধীনতা দিবস, বড়দিন, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, নববর্ষসহ জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসবগুলো দেশজুড়ে উদ্‌যাপিত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব রয়েছে, যেখানে নৃত্য, সংগীত, মুখোশ প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সমারোহ দেখা যায়। এসব উৎসব আইভরিকোস্টের বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

অর্থনীতি
আইভরিকোস্ট বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থাকলেও বর্তমানে শিল্প, সেবা ও নির্মাণ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি—কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, খনিজ সম্পদ, সমুদ্রবন্দরভিত্তিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, নির্মাণশিল্প।

আবিদজান বন্দর পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রবন্দরগুলোর একটি। মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়।

গত এক দশকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আফ্রিকার গড়ের চেয়ে বেশি ছিল। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং কৃষি রপ্তানি এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।

কৃষি
আইভরিকোস্টের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি কৃষি। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের মোট কোকো উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এই দেশ থেকে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় চকলেট কোম্পানির কাঁচামালের একটি বড় অংশ আইভরিকোস্ট থেকেই সংগ্রহ করা হয়। কোকোর পাশাপাশি উৎপাদিত হয়—কফি, কাজুবাদাম, রাবার, পাম তেল, কলা, আনারস, তুলা, ধান, ভুট্টা, কাসাভা ইত্যাদি।

কাজুবাদাম উৎপাদনেও আইভরিকোস্ট বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প ও খনিজ
দীর্ঘদিন কৃষিনির্ভর থাকলেও এখন শিল্প খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোকো প্রক্রিয়াজাত শিল্প, তেল শোধনাগার, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, রাসায়নিক শিল্প এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে দেশটি বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে সোনা, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, লোহা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। সরকার খনিজ খাতেও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে।

কর্মসংস্থান
দেশটির সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস এখনো কৃষি। তবে শহরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে এমন খাতগুলো হলো ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণশিল্প, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, পর্যটন ও খুচরা ব্যবসা।

যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা তুলনামূলক কম।

বৈদেশিক ঋণ
বড় বড় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও নগর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আইভরিকোস্ট বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫৫–৬০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনো সহনীয় বলে বিবেচিত হলেও সরকার ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার থেকে দেশটি অর্থায়ন সংগ্রহ করে।

মুদ্রা ও ব্যাংকিং
আইভরিকোস্টের মুদ্রা পশ্চিম আফ্রিকান সিএফএ ফ্রাঁ। এই মুদ্রা পশ্চিম আফ্রিকার আটটি দেশ যৌথভাবে ব্যবহার করে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেকাও (BCEAO), যা পুরো পশ্চিম আফ্রিকান অর্থনৈতিক ও মুদ্রা ইউনিয়নের জন্য কাজ করে। আবিদজান বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং ও আর্থিক কেন্দ্র।

অপরাধপ্রবণতা
গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে বড় শহরগুলোয় এখনো ছিনতাই, চুরি, মাদক পাচার, প্রতারণা ও সাইবার অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। সরকার পুলিশ আধুনিকীকরণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আগের তুলনায় অনেক কমলেও নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা মাঝেমধ্যে দেখা যায়।

আইভরিকোস্টে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব রয়েছে
এএফপি

স্বাস্থ্য
আইভরিকোস্টের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং কিছু সংক্রামক রোগ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

ক্রীড়া, ফুটবলের দেশ
আইভরিকোস্টে ফুটবল হলো জাতীয় আবেগ। দেশটির জাতীয় দল দ্য এলিফ্যান্টস নামে পরিচিত। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) একাধিকবার জিতেছে তারা। বিশ্ব ফুটবলে আইভরিকোস্টকে পরিচিত করে তুলেছেন—দিদিয়ের দ্রগবা, ইয়ায়া তুরে, কোলো তুরে ও সালোমন কালু।

২০২৪ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতে দেশটি আবারও মহাদেশের সেরা দলের মর্যাদা অর্জন করে। ফুটবলের পাশাপাশি বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিকস ও মার্শাল আর্টেও দেশটির অংশগ্রহণ রয়েছে।

পর্যটন
যদিও পর্যটন এখনো অর্থনীতির প্রধান খাত নয়। তবু এর সম্ভাবনা দ্রুত বাড়ছে। দেশটির আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে আটলান্টিক উপকূলের সমুদ্রসৈকত, তাই জাতীয় উদ্যান (ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য), কোমোয়ে জাতীয় উদ্যান, সেন্ট পল ক্যাথেড্রাল, ইয়ামুসুক্রোর বিশাল ব্যাসিলিকা। বন্য প্রাণী এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের জন্য সরকার নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে আইভরিকোস্টকে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, যুববেকারত্ব, আয়বৈষম্য, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষির আধুনিকীকরণ ও শিল্পায়ন। সরকার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।

আফ্রিকার ইতিহাসে আইভরিকোস্ট এক বৈপরীত্যের নাম। একদিকে ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধের স্মৃতি; অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনরুত্থান, কৃষিতে বিশ্বনেতৃত্ব এবং দ্রুত নগরায়ণের সাফল্য।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি চকলেটের পেছনে যেমন রয়েছে আইভরিকোস্টের কৃষকের ঘাম, তেমনি পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পেছনেও রয়েছে এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, মানবসম্পদ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দশকগুলোয় আইভরিকোস্ট শুধু পশ্চিম আফ্রিকার নয়, সমগ্র আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আরও সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে পারে।

নির্বাহী সম্পাদক, চিন্তানামা