ঢাকায় এসে বুঝেছি, মা আসলে কী

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

আমি সাতক্ষীরা শহরের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই মায়ের মমতা ছিল। আমি বেশ অসুস্থ থাকতাম। অসুস্থতা মানেই ছিল মায়ের ব্যস্ততা। কখনো সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কখনো প্রাইভেট হাসপাতালের দীর্ঘ সিরিয়াল, কখনো–বা সকালবেলা থেকে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা। মা নিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর আমাকে বসিয়ে রাখতেন যেন আমি ক্লান্ত না হয়ে পড়ি। রক্ত পরীক্ষা, রিপোর্ট সংগ্রহ কিংবা ডাক্তারের কক্ষের সামনে অপেক্ষা, প্রতিটি মুহূর্তে আম্মু ছিলেন ভরসা।

হাসপাতালের সেই বেঞ্চগুলোয় বসে আমি শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাঁর চোখে ঘুম ছিল না, ক্লান্তি ছিল না, ছিল শুধু সন্তানের সুস্থ হয়ে ওঠার অদৃশ্য প্রার্থনা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দোয়া বোধ হয় একজন মায়ের বুক থেকেই বের হয়।

প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত ভালো শিক্ষার্থী ছিলাম। হাইস্কুলে উঠে কিছুটা ফাঁকিবাজ হয়ে পড়ি। ফলাফল খারাপ হলে মা বকাঝকা করতেন। তখন তাঁর কথাগুলো খারাপ লাগত। মনে হতো, মা বুঝি শুধু রাগই করেন। অথচ আজ বুঝি, সেই বকাঝকার ভেতরেও ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা। হয়তো সে কারণেই একদিন জেদ করে সিদ্ধান্ত নিই, আমাকে ঢাকায় পড়তে হবে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে এখন ঢাকায় পড়াশোনা করছি। কিন্তু এই ঢাকা শহরে এসে বুঝেছি, স্বপ্ন পূরণের পথ যত বড় হয়, মায়ের কাছ থেকে দূরত্বটাও তত গভীর হয়ে যায়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে যখন ঢাকায় আসি, মা আমার সবকিছু নিজ হাতে গুছিয়ে দিয়েছিলেন। কাপড়, বই, প্রয়োজনীয় ছোট ছোট জিনিস, এমনকি কোনটা কোথায় রাখলে আমার সুবিধা হবে, সেটাও তিনি ভেবে দিয়েছিলেন। হয়তো ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু আমাকে বুঝতে দেননি। কারণ, মায়েরা নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে জানেন।

এই ব্যস্ত ঢাকা শহরে প্রায় সবার কাছেই তাদের মা আছেন। কেউ অসুস্থ হলে মা পাশে বসে থাকেন, কেউ রাতে ফোন করে খেয়েছ কি না জানতে চান, কেউ পরীক্ষার আগে মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। আর আমার মা আছেন গ্রামের বাড়িতে, অনেক দূরে। এই দূরত্ব শুধু পথের নয়, কখনো কখনো সেটা বুকের ভেতর জমে থাকা এক গভীর শূন্যতার নাম।

গত বছর ফাইনাল পরীক্ষার সময় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হই। শরীর খুব দুর্বল ছিল, তবু পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে একা একা মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেই রক্ত পরীক্ষা করিয়েছি, রিপোর্ট নিয়েছি, আবার ডাক্তার দেখিয়েছি। চারপাশে তাকিয়ে দেখেছি, সবার সঙ্গে তাদের মা–বাবা কিংবা প্রিয়জন আছে। কেউ সন্তানের মাথায় হাত রেখে সাহস দিচ্ছেন, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিচ্ছেন, কেউ আবার পরীক্ষার পর অপেক্ষা করছেন বাইরে দাঁড়িয়ে।

আরও পড়ুন

অসুস্থ অবস্থায় একাডেমির পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখলাম, অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের মায়েরা এসেছেন। কেউ সন্তানের ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ বারবার বলছেন, ‘ভয় পাস না, ভালো করে পরীক্ষা দে।’ দৃশ্যগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু সেদিন সেগুলো আমার বুকের ভেতর গভীর কষ্ট হয়ে জমেছিল। মনে হচ্ছিল, এই শহরে আমি সত্যিই একা। তখন খুব করে মাকে মনে পড়ছিল।

আজকাল ক্লাস কিংবা কোনো শিক্ষামূলক কাজ শেষে যখন ঢাকার বাসায় ফিরি, তখন সবচেয়ে বেশি মায়ের অভাব অনুভব করি। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে হঠাৎ মনে হয়, মা থাকলে হয়তো ভাত বেড়ে রাখতেন। হয়তো বলতেন, ‘হাত–মুখ ধুয়ে খেতে বসো।’ হয়তো কাপড়গুলো পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখতেন। মাথায় তেল দিয়ে দিতেন। ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে আমাকে ভাবতে হতো না।

এখন নিজের কাপড় নিজেকেই ধুতে হয়, অসুস্থ হলেও নিজেকেই ওষুধ খেতে মনে রাখতে হয়। জীবনকে গুছিয়ে নিতে গিয়ে মাঝেমধ্যে বুঝতে পারি, মা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি পূর্ণ পৃথিবীর নাম। মা পাশে থাকলে এলোমেলো জীবনটাও অদ্ভুতভাবে গুছিয়ে যায়।

হয়তো কোনো দিন মায়ের ঋণ শোধ করতে পারব না। তবু জীবনের প্রতিটি সফলতার পেছনে আমি শুধু একজন মানুষের মুখই দেখি, যিনি নিঃশব্দে নিজের সবটুকু দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন।

শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ