দীর্ঘ জীবন পেতে মানুষকে সহায়তা করতে পারে ১৯৪ বছর বয়সী কচ্ছপ!

সেন্ট হেলেনা দ্বীপে জোনাথন নামের কচ্ছপ। ১৯৪ বছর বয়সী জোনাথন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণীছবি: সেন্ট হেলেনা দ্বীপ সরকার

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত জোনাথন। সেশেলসের আলডাবরা প্রজাতির এই বিশাল কচ্ছপের বয়স আনুমানিক ১৯৪ বছর। এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা জানতে তার ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় এমন কিছু জিনের সন্ধান মিলেছে, যা কোষের ক্ষতি মেরামত করতে এবং প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব আবিষ্কার ভবিষ্যতে মানুষের বয়সজনিত শারীরিক অবক্ষয় ধীর করার চিকিৎসা গবেষণায় কাজে আসতে পারে।

সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জোনাথনের জিনোম, অর্থাৎ তার দেহের সম্পূর্ণ ডিএনএ ও এপিজিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এপিজিনোম হলো এমন কিছু নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যা জিনের কার্যক্রম চালু বা বন্ধ রাখতে ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের জীববিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহলেখক জাস্টিন গারলাখ বলেন, জোনাথনের মধ্যে ডিএনএ মেরামত এবং প্রদাহ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিশেষ জিন রয়েছে। গবেষণায় এমন ২৮৭টি জিনগত বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো কোষকে বয়সজনিত ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, কচ্ছপের দীর্ঘ জীবনের একটি কারণ হতে পারে তাদের ধীর বিপাকপ্রক্রিয়া। বিপাকপ্রক্রিয়া ধীর হলে কোষের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিও কম হতে পারে। ফলে কোষ ও ডিএনএর ক্ষতি তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে জোনাথনের ক্ষেত্রে শুধু ধীর বিপাকপ্রক্রিয়াই নয়, বার্ধক্যেও জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বজায় থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গারলাখের ভাষায়, মানুষের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এর ফলে ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু জোনাথনের শরীরে এখনো তুলনামূলক কম বয়সী প্রাণীর মতো জিনগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।

কেমন আছে জোনাথন
জোনাথনের সঠিক বয়স জানা নেই। ১৮৮২ সালের একটি ছবিতে তাকে পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় দেখা যায়। আলডাবরা প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত প্রায় ৫০ বছর বয়সে পূর্ণ আকার পায়। সেই হিসাব ধরে জোনাথনের বয়স এখন আনুমানিক ১৯৪ বছর। ২০২২ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপের গভর্নর তার জন্মদিন হিসেবে ১৮৩২ সালের ৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেন। তবে তার বয়স ২০০ বছর বা তার বেশি হতে পারে বলে মনে করেন গারলাখ।

১৮৮২ সালে তোলা একটি ছবি, যখন জোনাথন (বাঁয়ে) সেন্ট হেলেনায় এসে পৌঁছায়
ছবি: এ. এল. ইনেস

ভারত মহাসাগরের সেশেলস দ্বীপপুঞ্জে জন্ম নেওয়া জোনাথন জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। দৃষ্টিশক্তি হারালেও সে এখনো সক্রিয়। ওজন প্রায় ১৮০ কেজি।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা রক্ত না নিয়ে তার মুখের লালা থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর সেশেলসের আলডাবরা প্রবালপ্রাচীরের অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কচ্ছপের সঙ্গে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য তুলনা করেন। এতে জোনাথনের কোষের শক্তি উৎপাদনকারী অংশ মাইটোকন্ড্রিয়াও বেশ ভালো অবস্থায় থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলভিত্তিক কালেল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক স্টিফেন ক্লার্ক বলেন, দীর্ঘজীবী মানুষের মধ্যেও কার্যকর মাইটোকন্ড্রিয়ার উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। ভবিষ্যতে মাইটোকন্ড্রিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে—এমন ওষুধ খুঁজে বের করে মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।

আরও পড়ুন

আরও গবেষণা প্রয়োজন
তবে একটি কচ্ছপের জিন বিশ্লেষণ করে তার দীর্ঘ জীবনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তুরস্কের মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষক হানদান মেলিকে দোনেরতাশের মতে, জোনাথনের মতো দীর্ঘজীবী প্রাণীর সঙ্গে অন্য প্রাণীদের তুলনামূলক গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণাটির কিছু পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর অধ্যাপক ভিনসেন্ট জে. লিঞ্চ। তাঁর মতে, ব্যবহৃত বিশ্লেষণপদ্ধতিতে কিছু উপকারী জিনগত পরিবর্তনকে ক্ষতিকর কিংবা ক্ষতিকর পরিবর্তনকে উপকারী হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি রয়েছে।

তবু গবেষকেরা মনে করছেন, জোনাথনের মতো দীর্ঘজীবী প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা বার্ধক্য ও ক্যানসার সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। সেই জ্ঞান ভবিষ্যতে মানুষের সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতেও সহায়তা করতে পারে।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন