আব্বা গ্রামে থাকেন। একবার আমার বাসায় এলেন। আমার স্ত্রী মিথিলার তখন টাইফয়েড। আব্বা আর মা প্রথমে বড় ভাইয়ের বাসায় এসেছেন। একই সময়ে বড় ভাই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। তাঁদের যেন দিশাহারা অবস্থা। সকালে আমার বাসায় এসেছেন।
মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে শাশুড়ি এসেছিলেন আগেই। মিথিলা বিছানায় জ্বরের সঙ্গে লড়ছে। ঘরের সবকিছু এলোমেলো। আমার মা আর শাশুড়ি এটা-ওটা খুঁজে সকালের রান্নাবান্না চালিয়ে নেন। আমি তৈরি হয়ে অফিসে যাই।
বাসায় তেমন বাজারও নেই। আব্বা-মা এসেছেন বলে দুপুরের জন্য শাশুড়ি ফ্রিজ খুঁজে ইলিশ মাছ বের করলেন। মিথিলার জ্বর একটু ছাড়লে দুই মাকে এটা-সেটা খেতে বলে। তাঁরা বলেন, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমরা ম্যানেজ করে নেব।’
আব্বা ও মা দুপুরে খেতে বসেছেন। শাশুড়ি আপ্যায়ন করছেন। আব্বার পাতে ইলিশ মাছের মাথাটা দিলেন। ‘না না, দাঁত নেই। খেতে পারব না’—বললেও আমার শাশুড়ি জোর করে দিলেন। মা-ও সাপোর্ট করে বললেন, ‘খান তাইলে। আপনে তো মাথা পছন্দ করেন।’
আব্বা হঠাৎ আপ্লুত হয়ে গেলেন। যেন অতীতে ফিরে গেলেন। একান্নবর্তী সংসারে শখের হলেও মাছের মাথা তাঁর ভাগ্যে সব সময় জুটত না। আব্বার চোখে জল। কান্নাভেজা কণ্ঠে আমার শাশুড়িকে বললেন, ‘জানেন আপা, আমি আমার সন্তানদের কখনোই বড় মাছটি খাওয়াইতে পারি নাই। ভাঙা মাছের কাঁটাকুটাই পাতে যা দিছে; তা-ই খাইছে। কোনো সময় ওরা এইটা নিয়া মন খারাপ করে নাই। আর আজ দেখেন, আমার ছেলে আমারে বড় মাছের মাথা খেতে দেয়।’
আমার শাশুড়ি ও মায়ের চোখেও জল। আব্বা খাবার রেখে দুই হাত তুললেন। মোনাজাতে বললেন, ‘আল্লাহ আমার সন্তানরে আরও অনেক বেশি দিয়ো।’
সেবার আব্বা আর মা আমার বাসায় এক রাত ছিলেন। পরদিন সকালে বড় ভাইকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেলেন। আব্বা-মা সব সময় আমাদের পাশে থাকতে না পারলেও সারা জীবনের জন্য দোয়া করে গেলেন। আব্বাও একসময় ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। এখনো বাসায় বড় মাছ কিনে আনলে আব্বার কথা মনে পড়ে। মাছের মাথাটা যদি আব্বার পাতে দিতে পারতাম। এই আক্ষেপ প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
সাবেক সভাপতি, মাদারীপুর বন্ধুসভা