এক হাতেই গড়ে তুলেছেন আত্মসম্মানের অনন্য গল্প
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার খাজুরিয়া লক্ষ্মীপুর গ্রাম থেকে প্রতিদিন একজন মানুষ বের হন জীবিকার সন্ধানে। এক হাতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্য হাতে অদম্য সাহস। নাম তাঁর রুহুল আমিন। জন্ম থেকেই এক হাত না থাকলেও জীবনের কাছে তিনি কখনো হার মানেননি; বরং কঠিন বাস্তবতার বুক চিরে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন আত্মসম্মান ও পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে।
৯ বছর ধরে বিভিন্ন মার্কেটিং কোম্পানিতে কাজ করে চলেছেন রুহুল আমিন। বর্তমানে তিনি একটি গ্লোবাল কোম্পানির চাঁদপুর সদর উপজেলায় একজন সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআর)। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা—রোদ, বৃষ্টি ও ক্লান্তি উপেক্ষা করে শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান পণ্যের ব্যাগ, কলম ও মেমো হাতে। মাসে প্রায় আট লাখ টাকার সেলস করেন তিনি। অথচ মাসিক বেতন মাত্র ১২ হাজার টাকা।
এই সামান্য আয়েই চলছে রুহুল আমিনের সংসার—বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়ে। দিন দিন বাড়ছে সংসারের খরচ, কিন্তু বাড়ছে না আয়। তবু অভিযোগ নয়, কণ্ঠে শুধু বাস্তবতার ভার, ‘খরচ বাড়ছে, বেতন বাড়ছে না। সংসার চালানো এখন অনেক কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।’
এর আগে বাংলাদেশী নামকরা কোম্পানিতে কাজ করতেন রুহুল আমিন। তিন ভাইয়ের মধ্যে রুহুল আমিন সবার ছোট। বড় দুই ভাই কৃষিকাজ করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমি ভিক্ষা করি না। কারও কাছে চাইতেও লজ্জা লাগে। তবে কেউ নিজে থেকে সহায়তা করলে সেটা আলাদা বিষয়। আমি শুধু নিজের পরিশ্রমে বাঁচতে চাই।’
সাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল চালাতে না পারায় মাঠপর্যায়ে কাজের সুযোগ সীমিত। না হলে হয়তো সেলসের পরিমাণ আরও বাড়ানো যেত। তবু কোনো আক্ষেপ নেই, আছে শুধু শুকরিয়া।
রুহুল আমিনের স্বপ্ন খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর—একটু আর্থিক সহায়তা পেলে ছোটখাটো একটি ব্যবসা শুরু করতে চান। একটি ছোট দোকান দিতে পারলে সংসারটা একটু ভালোভাবে চলবে এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, তাঁর দুই মেয়েকে মানুষ করা। তিনি বলেন, ‘ওদের যেন আমার মতো কষ্ট না হয়’। এ কথা বলতে গিয়ে চোখে ভাসে এক বাবার নীরব অঙ্গীকার।
আজকের সমাজে যখন অনেক সুস্থ মানুষও অলসতার পথ বেছে নেয়, তখন রুহুল আমিন হয়ে ওঠেন আলোর প্রদীপ। তিনি প্রমাণ করেন যে প্রতিবন্ধকতা শরীরে নয়, মানসিকতায়। এক হাতে কাজ করেও দুই হাতে স্বপ্ন গড়া যায়, যদি ইচ্ছা, সাহস ও আত্মসম্মান থাকে।
সদস্য, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভা