একটা ফল, এত পরিচয় কেন
ভাদ্রের দুপুর। তপ্ত রোদে অজান্তেই মনে জাগে চিরচেনা আকুতি ‘তালপাকা গরম’! গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তালগাছ। মাথার ওপর গোল গোল পাতার মুকুট। বাতাস এলে পাতাগুলো কেঁপে ওঠে। দেখে মনে হয় গাছটি বুঝি আকাশের সঙ্গে গোপনে আলাপ করছে। নিচে পড়ে থাকা পাকা তালের ম-ম ঘ্রাণে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। কেউ তাল কুড়াচ্ছে কেউবা তাল নিয়ে ফিরছেন বাড়ির পথে। কোনো ঘরে হয়তো ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে তালের বড়া, পিঠা কিংবা পায়েস তৈরির আয়োজন। কড়াইয়ে বড়া ভাজার মিষ্টি ঘ্রাণ যেন জানিয়ে দেয় শরৎ এসেছে তার চেনা স্বাদ আর স্নিগ্ধ আমেজ নিয়ে।
ঋতুচক্রে তাল শরতের এক পরিচিত উপহার। কচি তালশাঁস থেকে পাকা ফল, পাল্প থেকে বড়া-পিঠা, রস থেকে গুড়—নানা রূপে তাল জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে। স্বাদ ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি মৌসুমি এই ফলের পুষ্টিগুণও একে করে তুলেছে গুরুত্বপূর্ণ।
কচি তাল কাটলে পাওয়া যায় নরম, স্বচ্ছ ও রসালো শাঁস। এর কোমল গঠন ও মৃদু স্বাদ গরমের দিনে বেশ তৃপ্তিদায়ক। ফল পাকলে বদলে যায় তার রূপ ও ব্যবহার। পাকা তালের হলুদাভ, আঁশযুক্ত পাল্প দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার।
বাংলার ঘরোয়া রান্নায় তালের বড়া পিঠা সবচেয়ে সুস্বাদু। পাকা তালের পাল্পের সঙ্গে চালের গুঁড়া ও প্রয়োজনমতো অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি হয় বড়া। গরম তেলে ভাজার পর বাইরে সোনালি, ভেতরে নরম বড়াটি মুখে তুললে মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে মেলে তালের নিজস্ব ঘ্রাণ। কোথাও এই পাল্প দিয়ে তৈরি হয় পিঠা, পায়েস কিংবা হালুয়া। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে এসব খাবারের প্রস্তুত প্রণালিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। একই ফলের কচি ও পাকা অবস্থায় স্বাদ, গঠন ও ব্যবহারের পার্থক্য তালের বিশেষত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাল শুধু স্বাদের ফল নয়, পুষ্টিরও একটি উৎস। পাকা তালের পাল্পে শর্করা, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উদ্ভিজ্জ উপাদান থাকে। শর্করা শরীরে শক্তি জোগায়, আর খাদ্য আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় তালের পাল্পে ফেনলিক যৌগ, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ক্যারোটিনয়েডের মতো উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এসব উপাদানের কিছু অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পুষ্টিমান ফলের জাত, পরিপক্বতা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভর করে। কচি তালশাঁস ও পাকা তালের পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য একই নয়। তালের বড়া, পিঠা কিংবা পায়েসে অতিরিক্ত তেল ও চিনি যোগ হলে ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই ফল হিসেবে তাল খাওয়া এবং তাল দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন খাওয়ার পুষ্টিগত দিক একভাবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। মৌসুমি ফল হিসেবে তাল খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনে। তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য শুধু একটি ফলের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য ফল, শাকসবজি, ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও খেতে হবে। পরিমিত পরিমাণে তাল খাওয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এর বিভিন্ন পদ তৈরি করাই ভালো।
গ্রামে তাল পাকতে শুরু করলে শুরু হয় আলাদা ব্যস্ততা। নতুন মেয়েজামাইকে তালের পিঠা খাওয়ানোর ধুম পড়ে। এ জন্য রসদ জোগাড় করার প্রস্তুতি নিতে হয়। পিঠা তৈরির জন্য পাল্প বের করা, আঁশ ছেঁকে নেওয়া, বড়ার মিশ্রণ তৈরি সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হয় একধরনের আয়োজন। একচিলতে উৎসবমুখর রাজ্যে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে তালের বড়ার ঘ্রাণ। পিঠার পাশাপাশি চুলায় থাকে লোভনীয় পায়েস।
তালের ব্যবহার ফল খাওয়ার মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। তালগাছ গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে বহুল ব্যবহৃত বৃক্ষ। তালপাতা দিয়ে তৈরি হয়েছে পাখা ও নানা লোকজ সামগ্রী। একসময় তালপাতা লেখার উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। বহুমুখী ব্যবহার গ্রামীণ জীবনে গাছটির দীর্ঘদিনের উপস্থিতির পরিচয় বহন করে।
ভাষা ও সাহিত্যেও তাল বেশ সুপরিচিত ও সমৃদ্ধ। ‘তালপাতার সেপাই’, ‘তিলকে তাল করা’ কিংবা ‘তালগোল পাকানো’ এমন সব বাগ্ধারা দৈনন্দিন কথাবার্তায় জায়গা করেছে। সংগীতে ‘তাল’ ছন্দের নির্দিষ্ট বিন্যাস বোঝায়। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ কবিতায় গাছটি যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে উঁকি মারে—
‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।’
শিশুর কল্পনায় তালগাছ তখন শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, আকাশ ছুঁতে চাওয়া এক প্রাণবন্ত সত্তা।
তালের পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গেলে মৌসুমি ফল হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে। ঘরোয়া রান্নায় নতুন রেসিপি তৈরি, পরিবারে শিশুদের দেশীয় ফলের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে তালের খাবার নিয়ে আয়োজন এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পাকা তালের পাল্প স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কৌশল জানা থাকলে মৌসুমে এর ব্যবহার আরও সহজ হতে পারে।
শরৎ আসে। তাল পাকে। রান্নাঘরে জেগে ওঠে পরিচিত স্বাদ। কখনো কচি তালশাঁসের রসালো কোমলতা, কখনো পাকা তালের স্বতন্ত্র ঘ্রাণ, কখনো-বা সদ্য ভাজা বড়ার মিষ্টি স্বাদ। তালের প্রতিটি রূপেই রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। মৌসুমি এই ফলকে শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে না রেখে জায়গা দেওয়া যাক আমাদের খাদ্যাভ্যাসে। পুষ্টির কথা ভেবে তাল খাই, নতুন রেসিপিতে এর স্বাদ আবিষ্কার করি, পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পরিচিত করে তুলি। পাশাপাশি তালগাছ লাগাতে উৎসাহিত করি।
তাল মাটিতে জন্মায় কিন্তু তার মাথা থাকে আকাশের দিকে। তালগাছের শিকড় গ্রামে অথচ তালের উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে মানুষের খাবার, ভাষা, কবিতা ও স্মৃতিতে। শরৎ শেষে গাছ থেকে ঝরে পড়ে শেষ ফলটিও; কিন্তু তালের স্বাদ থেকে যায় রান্নাঘরে, পুরোনো রেসিপিতে কিংবা স্মৃতিতে। শরতের সঙ্গে যার এত সখ্য, সেই তাল হয়ে উঠুক আমাদের মৌসুমি খাদ্যাভ্যাসের আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাবেক সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা