আমার শিক্ষক ট্রলারচালক মিলন ভাই
আমার প্রিয় শিক্ষক পেশায় একজন ট্রলারচালক। সবাই মিলন ভাই বলে সম্বোধন করে।
ওনার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল ঝালকাঠির ভিমরুলি পেয়ারাবাগানে ঘুরতে যাওয়ার সময়। নলছিটি থেকে ঝালকাঠি যাতায়াতের পথে ছোট্ট সুগন্ধা নদীতে মানুষ পারাপার করেন তিনি।
তবে শুধু মানুষ পারাপার করেন বললে মিলন ভাইয়ের কাজটাকে ঠিকভাবে বলা হবে না। তিনি যেন মানুষের উপকার করার সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। কোনো মানুষ ব্যাগ তুলতে পারছেন না, কোনো বৃদ্ধ ট্রলারে উঠতে কষ্ট পাচ্ছেন—এমন যেকোনো পরিস্থিতিতে মিলন ভাইকে পাশে পাওয়া যায়।
গত বছর বাসা পরিবর্তনের সময় মিলন ভাইয়ের ট্রলার ভাড়া নিয়েছিলাম। যাত্রাপথে তাঁর এ কাজের কথা জানতে চাইলে হেসে বললেন, ‘ম্যাডাম, আইজ ১০০ জনের উপকার করলে পরের দিন সংখ্যাডারে ১০১ বানাবার টেরাই করি। আমনেগো দোয়ায় আল্লায় সবদিক দিয়া বালো রাখছে।’
সেদিন মিলন ভাইয়ের কথায় সত্যিই থমকে গিয়েছিলাম। কী সুন্দর মানুষের চিন্তাভাবনা! কী অসাধারণ এক জীবনচর্চা! প্রতিদিন নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা—আজ ১০০ জনের উপকার করেছি, আগামীকাল অন্তত ১ জন বেশি মানুষের উপকার করব। কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা নেই, প্রচারের আকাঙ্ক্ষা নেই; আছে শুধু মানুষের জন্য কিছু করার আনন্দ।
সেদিন মিলন ভাইয়ের কাছ থেকে যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, কোনো শিক্ষার্থীকে সারা দিন লেকচার দিয়েও হয়তো সেই শিক্ষা দিতে পারব না। কারণ, কিছু শিক্ষা বই থেকে আসে না। কিছু শিক্ষা আসে মানুষের আচরণ থেকে, নিঃশব্দ ভালো কাজ থেকে, প্রতিদিনের জীবনচর্চা থেকে।
আমরা যাঁরা শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সহমর্মিতার কথা বলি; কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো পাঠ্যবই না পড়িয়েই প্রতিদিন এসব মূল্যবোধের বাস্তব পাঠ দিয়ে চলেছেন। মিলন ভাই তাঁদেরই একজন।
সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা), ঝালকাঠি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়