কেন হারিয়ে যাচ্ছে নকশা আঁকা টমটম গাড়ি

টমটম গাড়িছবি: সংগৃহীত

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই টমটম গাড়ির ওপর এগুলো কারা আঁকেন?’
সরল উত্তর, ‘মেয়ে–ছেলেরা’।

আমাকে অবাক করে দিল। বাংলায় নারী–পুরুষ যুগ যুগ ধরে একসঙ্গে কর্ম করে চলেছেন। এটি তার ছোট একটি উদাহরণ। পূজার সময় তাঁরা সুদূর বগুড়া থেকে আসেন আমাদের এ তল্লাটে বাণিজ্য করতে। তাঁদের সঙ্গে আমার সখ্য ছোটবেলা থেকেই। বছরে অন্তত একবার সাক্ষাৎ হয়।

খুলনা জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁদের কাছে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আসেন টমটম গাড়ি সংগ্রহ করতে। পরে এগুলো বিভিন্ন মেলায় পাওয়া যায়। আগে তাঁদের অনেক বৃহৎ পরিসরে আসতে দেখেছি। তখন ট্রাকভর্তি সওদার জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন; জনবলও যথেষ্ট থাকত। এখন দিন বদলেছে, বাচ্চারা এসব ইন্টারঅ্যাক্টিভ খেলনাসামগ্রী থেকে কৃত্রিম সিমুলেশন; ফোন স্ক্রিনের প্রতি বেশি আকর্ষিত। এ ছাড়া পরিবহন খরচ, কাঁচামালের দামও বাড়ছে। ফলে তাঁদের বাণিজ্য সংক্ষিপ্ত হয়েছে। প্লাস্টিক এবং বিদেশি খেলনার দাপট তো আছেই!

টমটম গাড়ি বানাচ্ছেন কারিগরেরা।
আরও পড়ুন

টমটম গাড়ির গঠনের দিকে তাকানো যাক। মূল বডি তৈরি হয় গোলাকার (অর্ধগোলাকৃতির) পোড়ামাটি দ্বারা। সম্পূর্ণ বডি ধরে রাখে বাঁশের কর্তিতাংশ (খুব শক্তিশালী গঠন) এবং প্লাস্টিকের সুতলি। দেখলে মনে হবে প্রসিদ্ধ গ্রামীণ কোনো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের দক্ষ হাতে তৈরি; কিন্তু একটি টমটম গাড়ি তৈরিতে যথেষ্ট হাতবদল হয়—কখনো পুরুষ, কখনো নারী। সবার অবদান অনস্বীকার্য।

এখন একটি টমটম গাড়ির দাম ২০ টাকা। ক্রমবর্ধমান বাজারে দুই বছর ধরে এ দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ছোটবেলায় যখন টমটম গাড়ি চালিয়েছি, তখন দাম ছিল সর্বসাকল্যে ১০ টাকা; কিন্তু এর যে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাকানিকস, তার কাছে হয়তো এই অর্থমূল্য অনর্থক। কারণ, একটি টমটম গাড়ি সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার এক অভূতপূর্ব মিশেল রূপ। সৌন্দর্যের কোনো অর্থমূল্য হয় না। টমটম গাড়ির শব্দ ও সৌন্দর্য ছেলে–বুড়ো সবাইকে আকৃষ্ট করতে পারে।

টমটম গাড়ির উপরিভাগের নকশা আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। এই নকশা–আঁকিবুঁকিতে মিশে আছে গ্রামবাংলার নারীদের সরল জীবনধারার অনুগল্প।

বন্ধু, খুলনা বন্ধুসভা