রেললাইনে পাথর থাকলেও মেট্রোরেলে নেই কেন

কোলাজ: এআই/বন্ধুসভা

মেট্রোরেলের জানালা দিয়ে নিচে তাকালে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। ট্রেন ছুটছে, দুটো চকচকে রেললাইন পাশাপাশি চলে গেছে, কিন্তু সেই চেনা পাথরগুলো কোথায়?

আমরা ছোটবেলা থেকে রেললাইন মানেই দেখেছি দুটি লোহার রেললাইন, তার নিচে স্লিপার আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাথর। অথচ মেট্রোরেলের ট্র্যাকে সেই পাথর নেই। তাহলে কি রেললাইনের পাথর শুধুই পুরোনো দিনের কোনো প্রযুক্তি? নাকি এর পেছনে আছে এমন কোনো বিজ্ঞান যা মেট্রোরেলে অন্যভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?

রেললাইনের নিচে ছড়িয়ে থাকা এসব পাথরকে বলা হয় ট্র্যাক ব্যালাস্ট। একটি ভারী ট্রেন যখন রেললাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যায়, তখন তার ওজন ও চলাচলের ফলে তৈরি হওয়া চাপ রেললাইন থেকে স্লিপারে এবং স্লিপার থেকে নিচের মাটিতে পৌঁছায়। ব্যালাস্ট এই চাপকে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকায় ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। ফলে ট্রেনের বিপুল ভার সরাসরি এক জায়গায় গিয়ে মাটিকে দুর্বল করে ফেলে না।

কিন্তু পাথরই কেন? কারণ, ব্যালাস্টের পাথরগুলো সাধারণত গোল নয়, বরং কৌণিক ও ধারালো। ফলে তারা পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে। এই ইন্টারলকিংয়ের কারণে ট্রেনের চলাচলে সৃষ্ট চাপ ও কম্পনের মধ্যেও স্লিপার সহজে সরে যেতে পারে না। অর্থাৎ পাথরগুলো শুধু ভার সামলায় না, বরং রেললাইনকে তার নির্দিষ্ট অবস্থানেও স্থির রাখে।

ব্যালাস্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পানি নিষ্কাশন। পাথরগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে যেতে পারে। এতে রেললাইনের নিচের মাটি দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজে নরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশের মতো বর্ষাপ্রবণ দেশে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচলের ফলে ট্র্যাকের অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন হলে ব্যালাস্ট সরিয়ে, যোগ করে বা পুনর্বিন্যাস করে রেললাইনের উচ্চতা ও অবস্থান ঠিক করা যায়। অর্থাৎ ব্যালাস্ট শুধু ট্র্যাককে ধরে রাখে না, প্রয়োজনে ট্র্যাককে আবার সঠিক অবস্থানেও ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

তাহলে মেট্রোরেলে এসব পাথর নেই কেন?
কারণ, মেট্রোরেল একই সমস্যার অন্য ধরনের প্রকৌশলগত সমাধান বেছে নিয়েছে। ঢাকার এমআরটি লাইন ৬–এর উড়ালপথের মূল ট্র্যাকে ব্যালাস্টের পরিবর্তে শক্ত কংক্রিট কাঠামোর ওপর রেললাইন স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ট্র্যাককে স্থির রাখার দায়িত্ব মূলত সেই শক্ত কাঠামো ও বিশেষ ট্র্যাক-সাপোর্ট ব্যবস্থা পালন করে। তাই আলাদা করে ব্যালাস্টের স্তর প্রয়োজন হয় না।

তবে পাথর না থাকলেই যে কম্পন বা শব্দের সমস্যা নেই, তা নয়। বরং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলা মেট্রোরেলের জন্য কম্পন নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ট্র্যাকের নকশা, রেললাইনের সংযোগ এবং বিশেষ কম্পন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করে ট্রেন চলাচলের সময় সৃষ্ট কম্পন ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। আর পানি নিষ্কাশনের কাজও ভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ সাধারণ রেললাইনে যে কাজের একটি অংশ ব্যালাস্ট করে, মেট্রোরেলে সে দায়িত্বের অনেকটাই নিয়েছে কংক্রিটের কাঠামো ও আধুনিক ট্র্যাকপ্রযুক্তি।

রেললাইনের পাথর তাই নিছক পাথর নয়, আর মেট্রোরেলের পাথরহীন ট্র্যাকও কোনো পাথরবিরোধী প্রযুক্তি নয়। বরং একই সমস্যার দুটি ভিন্ন প্রকৌশলগত পদ্ধতি। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে ট্রেনকে কীভাবে নিরাপদ, স্থিতিশীল, টেকসই ও আরামদায়ক রাখা যায়। কারণ, প্রকৌশলে কোনো উপাদান চিরকালীন নয়। প্রয়োজন, পরিবেশ ও প্রযুক্তিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে যে কোথায় পাথর থাকবে আর কোথায় পাথরের প্রয়োজন হবে না।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, খুলনা বন্ধুসভা