ছয় শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী বিনত বিবির মসজিদ

বিনত বিবির মসজিদের গম্বুজ, যা এখনো অক্ষত রয়েছে।

‎পুরান ঢাকার ব্যস্ত অলিগলি। রিকশার ঘণ্টি, মানুষের কোলাহল আর প্রতিদিনের ছুটে চলা নগরজীবনের ভিড় পেরিয়ে নারিন্দার এক কোণে গেলে হঠাৎ চোখে পড়ে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। সময়ের স্রোতে নগরীর রূপ বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা; কিন্তু প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে ইতিহাসের ভার বয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিনত বিবির মসজিদ।

‎ঢাকাকে আজ আমরা মসজিদের শহর বলে চিনি। আর সেই পরিচয়ের সূচনালগ্নের অন্যতম স্মারক এই মসজিদ। এর ইটের গায়ে লেগে আছে ছয় শ বছরের ইতিহাস, প্রতিটি দেয়াল যেন বলে যায় পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের গল্প।

ইতিহাস
‎বিনত বিবির মসজিদের পরিচয়ের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে, স্বাধীন সুলতানি আমলে। তখন বাংলার সালতানাত পরিচালনা করতেন নাসির উদ-দীন মাহমুদ শাহ। সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সমাজে যখন পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তখন নিজস্ব অর্থ ও উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণ করেন মারহামাতের ধর্মপ্রাণ কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি। তাঁর নামেই কালক্রমে মসজিদটি পরিচিত লাভ করে।

‎পুরান ঢাকার নারিন্দা রোড ও পঞ্চবাটি মোড়ের নিকটবর্তী এলাকায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদ। আজ যেখানে ঘনবসতি, শত শত বছর আগে পুরান ঢাকার এ এলাকা (নারিন্দা-ধোলাইখাল) ছিল জলপথনির্ভর বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তখন এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গার একটি শাখা প্রবাহিত হয়ে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বণিকেরা এ পথে বাণিজ্য করতে আসতেন।

‎ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, আরাকান আলী নামক এক সওদাগর সে সময় এ এলাকায় বাণিজ্যের জন্য আসেন এবং বসবাস শুরু করেন। তখন নামাজ পড়ার সুবিধার্থে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

বর্তমানে পুরোনো ভবন ঠিক রেখে নতুন মসজিদ ভবণ নির্মিত হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত

‎স্থাপত্য
আদি মসজিদটি ছিল মূলত বর্গাকার ও এক গম্বুজবিশিষ্ট। এর চার কোণে ছিল চারটি ছোট অষ্টকোণাকৃতি বুরুজ বা মিনার। চুন-সুরকি ও পাতলা ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালে ছিল পোড়া মাটির ফলক (টেরাকোটা) ও জ্যামিতিক কারুকাজ, যা বাংলার আদি মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভেতরের আয়তন ছিল ৩.৬৩ বর্গমিটার। প্রতিটি দেয়াল ৩.৬৩ মিটার প্রশস্ত।

‎ক্ষুদ্র পরিসরের এই স্থাপনা আয়তনে খুব বড় না হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বে তা বিশাল। ইটের প্রতিটি স্তর যেন সাক্ষ্য দেয় একটি সময়ের—যে সময়ে ঢাকা আজকের মতো জনারণ্য ছিল না, ছিল নদী ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক জনপদ।

আরও পড়ুন

সময়ের সঙ্গে বদলেছে কাঠামো
সময় কখনো স্থির থাকে না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মসজিদটির কাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন।

৮৬১ হিজরিতে নারিন্দা রোডের এ মসজিদটির প্রথম সংস্করণ করা হয় এবং ৮৬৬ হিজরিতে বিনত বিবি ও আরাকান আলীর সমাধিস্থলে একটি মাজার স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলা ১৩৩৭ সালে এ মসজিদের দ্বিতীয় সংস্করণ করা এবং দ্বিতীয় গম্বুজটি যুক্ত করা হয়। সময়ের প্রয়োজন ও মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের পরিসরও পরিবর্তিত হয়েছে।

আজ মসজিদটির আশপাশে আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড় আর উঁচু ভবনের সারির মধ্যেও পুরোনো স্থাপনাটি যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়।
এলাকাবাসী ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে বর্তমানে পুরোনো ভবন ঠিক রেখে নতুন তিনতলা মসজিদ ভবণ নির্মিত হয়েছে। নতুন স্থাপনার ব্যস্ততার মধ্যেও পুরোনো কাঠামোটি যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতুবন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় বন্দী কোনো বিষয় নয়। কখনো কখনো ইতিহাস আমাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে—পুরোনো ইটের দেয়ালে, ক্ষয়ে যাওয়া কারুকাজে, কিংবা শতাব্দী পেরিয়ে টিকে থাকা কোনো স্থাপনার নীরবতায়।

বিনত বিবির মসজিদ
ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে যাবেন
ইতিহাসের এই সাক্ষীর কাছে যেতে চাইলে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে গুলিস্তান আসুন। গুলিস্তান থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে নারিন্দায় মসজিদটি অবস্থিত। রিকশায় করে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে নারিন্দা বিনত বিবির মসজিদ বললেই পৌঁছে যাবেন।

পুরান ঢাকার স্বাদ
মসজিদ পরিদর্শনের পর ঘুরে দেখা যেতে পারে পুরান ঢাকার আশপাশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানগুলো। কাচ্চি, মোরগ পোলাও, তেহারি, কাবাব—সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার খাবারের আলাদা এক জগৎ। এর মধ্যে নারিন্দায় অবস্থিত ঝুনু পোলাও ঘর, সিটি তেহারি ঘর হতে পারে খাবারপ্রেমীদের একটি গন্তব্য। পুরান ঢাকার বিখ্যাত বাকরখানি তো আছেই। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে বাকরখানি চুবিয়ে এক কামড় দিতে দিতে হয়তো মনে হবে, এই শহরের স্বাদ কেবল খাবারে নয়, তার প্রতিটি অলিগলি, পুরোনো স্থাপনা আর শত বছরের গল্পেও মিশে আছে।

বিনত বিবির মসজিদ তাই শুধু ইট-পাথরের একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি ঢাকার নগরায়ণের শুরুর সময়ের স্মৃতি, বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক পুরোনো নিদর্শন এবং কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা জীবন্ত ইতিহাস। আধুনিক ঢাকার কোলাহলের মধ্যেও যে ইতিহাস আজও নিঃশব্দে কথা বলে যায়।

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়