আমি আজ মানুষ হিসেবে যতটুকু, তার অনেকটাই বাবার জন্য। শুধু জন্মদাতা হিসেবে নয়, আমার ভেতরের মানুষটার ভিত্তি নির্মাণের কারিগর হিসেবেও।
আমার বয়স তখন ছয় কি সাত। বাড়ির উল্টো দিকে একটা ছোট্ট মাঠ, তার পাশেই শাপলায় ঢাকা পুকুর। পুকুরপাড়জুড়ে কচুগাছ, বকুলের মিষ্টি গন্ধ আর হিজলগাছের ছায়া। বিকেলগুলো রঙিন হয়ে থাকত প্রজাপতি আর ফড়িংয়ের ডানায়। আমরা ছোটরা মেতে থাকতাম ফড়িং ধরার খেলায়। সেদিনও একটি ফড়িং ধরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বাবা বাড়ির সামনের কুকুর লালুকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছিলেন। আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন-
‘ওকে ছেড়ে দে, বাবা। তুই যেমন সন্ধ্যা হলে খেলে বাড়ি ফিরিস, তেমনই ওরও একটা ঘর আছে। সেখানে হয়তো ওর মা অপেক্ষা করছে।’
তখন কথাগুলোর গভীরতা বুঝিনি। ফড়িংটাকে ছেড়ে দিয়ে আবার খেলায় মেতে উঠেছিলাম। আজ বুঝি, বাবা সেদিন একটি ফড়িংকে মুক্ত করেননি; আমার ভেতরে সহমর্মিতার প্রথম দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন।
আরেক দিন, উৎসবের ভিড়ে আলোঝলমলে দোকানের পাশে শিশুকে কোলে নিয়ে খেলনা বিক্রি করছিলেন এক মা। আমরা খেতে ঢুকেছিলাম রেস্টুরেন্টে। বাবা চুপচাপ শিশুটির জন্য দুধ আর তার মায়ের জন্য খাবার কিনে দিয়েছিলেন। কোনো ঘোষণা নয়, কোনো প্রদর্শনও নয়; যেন এটাই স্বাভাবিক, এটাই মানুষের কাজ।
বাবা কোনো দিন বড় বড় আদর্শের কথা বলেননি। অথচ তাঁর ছোট ছোট কাজই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে রয়ে গেছে। তিনি শিখিয়েছেন, পৃথিবীটা শুধু নিজের জন্য নয়; অন্যের ক্ষুধা, অন্যের কষ্ট, অন্যের অপেক্ষাও আমাদের মানবিকতার অংশ।
আজ নিজের ভেতরে যতটুকু মমতা আর বিবেক খুঁজে পাই, মনে হয় তার শিকড় সেই শাপলাভরা পুকুরপাড়েই রয়ে গেছে। সেখানেই এক বিকেলে একজন বাবা, একটি ফড়িংয়ের গল্প বলতে বলতে অজান্তেই তাঁর ছেলেকে মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম পাঠটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার জীবনের প্রথম মানবিকতার পাঠশালার নাম—বাবা।
বাটানগর, কলকাতা ৭০০১৪০, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত