ধোঁয়ায় ঢাকা নদী

নদীর দুই পাশে একের পর এক ইটভাটা থেকে উঠা ধোঁয়া নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণ করছে
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

গুলিস্তান থেকে বাসে যাওয়ার কথা ছিল। টিকিট কেটে বাসে উঠে বসেছিলাম। মাত্র কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই মনে হলো, এই যাত্রা ঠিক আমার নয়। পাশে বসা ফুফাতো ভাইকে বললাম, ‘ভাইয়া, নেমে যাই? নদীপথে গেলে কেমন হয়?’ সে একটু তাকিয়ে হেসে বলল, ‘চল, নেমে যাই।’

সিদ্ধান্তটি ছিল একেবারেই হঠাৎ। পরে বুঝেছি, এই হঠাৎ সিদ্ধান্তই আমাকে অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। আমরা নেমে পড়লাম, শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে ছুটলাম লালকুঠির লঞ্চঘাটে। সেখানে গিয়ে জানলাম যে লঞ্চটি বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। মাঝপথে মুন্সিগঞ্জ ঘাটে থামবে, আর আমাদের গন্তব্য সেখানেই। আমরা লঞ্চে উঠে বসলাম, শুরু হলো অপেক্ষা।

নদীর দুই পাশে একের পর এক ইটভাটা থেকে উঠা ধোঁয়া নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণ করছে
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

প্রায় এক ঘণ্টা সময় কেটে গেল ঘাটের কোলাহল, মানুষের ভিড়, মালপত্র ওঠানামার শব্দ ও নদীর হালকা ঢেউয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তির অনুভূতিতে। একসময় লঞ্চটা নড়ল ধীরে, খুব ধীরে। যেন ঘুম ভাঙা কোনো দেহ। সেই নড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আমাদের নদীপথের যাত্রা। আমি সব সময় ক্যামেরা সঙ্গে রাখি। সেদিনও ব্যাগে ক্যামেরা ছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, নদীপথে নিশ্চয়ই কিছু সুন্দর মুহূর্ত ধরা পড়বে।

শুরুতে সবকিছু খুব শান্ত লাগছিল। নদীর দুই তীর, নরম ঢেউ, বাতাসে ভেজা গন্ধ আর আকাশের আলো—সব মিলিয়ে এক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়। ক্যামেরা হাতে নিলাম, চোখ খুঁজতে লাগল কোনো সুন্দর ফ্রেম। সেই খোঁজ বেশিক্ষণ টিকল না। কিছুদূর এগোতেই নদীর দুই পাশে একের পর এক ইটভাটা চোখে পড়ল, চিমনিগুলো থেকে উঠছে ঘন কালো ধোঁয়া, আর সেই ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের নীল রং মুছে দিয়ে জায়গা নিচ্ছে এক ধূসর ভারে। তখনো হাতে ক্যামেরা, কিন্তু মন আর আগের মতো ছিল না। যে চোখ সৌন্দর্য খুঁজছিল, সেই চোখই এখন দেখতে পাচ্ছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ধোঁয়াটা শুধু আকাশে আটকে নেই, ধীরে ধীরে নেমে আসছে নদীর বুকেও, জলের ওপর এক অদৃশ্য ভার তৈরি করছে।

আরও পড়ুন
নদীর জীবন
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

এই পানিতেই তো জীবন, এই পানিতেই মাছ বাঁচে, কৃষক জমি সেচ দেয়, মানুষ দৈনন্দিন জীবন চালায়; কিন্তু সেই পানি যদি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিকতা হারায়, তাহলে জীবনের ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে? নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঘরগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা এই ধোঁয়ার সঙ্গেই প্রতিদিন বসবাস করছে। শিশুদের শ্বাসে, বৃদ্ধদের কাশিতে, প্রতিদিনের নীরবতায় মিশে আছে এই দূষণ। একটু দূরে ফসলি জমি। যেখানে একসময় সবুজ ছিল, এখন সেখানে ধুলা আর ক্লান্ত মাটির এক নিঃশব্দ গল্প। প্রকৃতি যেন কিছুই বলছে না, শুধু সহ্য করে যাচ্ছে। কিন্তু এই সহ্যেরও তো একটা সীমা থাকে।

লঞ্চ যত সামনে এগোতে থাকল, বুঝতে পারছিলাম আজ আমি শুধু ছবি তুলতে আসিনি; বরং এমন এক বাস্তবতা দেখছি, যা ক্যামেরায় ধরা গেলেও পুরোটা ফ্রেমে আসে না। অবশেষে লঞ্চ মুন্সিগঞ্জ ঘাটে থামল, আমরা নেমে পড়লাম। কিন্তু নদীর সেই ধোঁয়ায় ঢাকা দৃশ্যটা যেন পেছনে থেকে গেল না; বরং ভেতরেও রয়ে গেল। মনে হচ্ছিল নদীটা শুধু পানি নয়, এটা যেন এক দীর্ঘশ্বাস, যেটা আমরা শুনতে পাই না অথবা শুনেও না শোনার ভান করি।

মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরতে থাকে—আমরা কি সত্যিই উন্নয়ন করছি, নাকি অজান্তেই এমন কিছু তৈরি করছি, যার ভার একদিন আমাদেরই বইতে হবে।

দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা–১২০৪