ভ্রমণের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে—কখনো কখনো কোনো শহরের একটি স্থাপনা, একটি রাস্তা বা এক বিকেলই পুরো শহরটাকে মনে গেঁথে দেয়। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ঘুরতে গিয়ে আমার কাছে তেমনই এক স্মৃতি হয়ে আছে ঐতিহাসিক সুলতান আবদুল সামাদ ভবন।
সেদিন বিকেলের আলো একটু নরম হয়ে আসছিল। শহরের ব্যস্ততা তখনো কমেনি, কিন্তু আকাশের রঙে একধরনের শান্তি নেমে আসে। আমি দাঁড়িয়ে আছি মারদেকা স্কয়ারের সামনে। রাস্তার ওপারে হঠাৎ চোখে পড়ল লালচে গম্বুজ আর খিলানে সাজানো এক বিশাল স্থাপনা। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন কোনো প্রাচীন রাজপ্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক শহরের মাঝখানে।
কাছাকাছি এগিয়ে গেলে বোঝা যায়, এই ভবন শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এ ভবনটি একসময় ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্র। কিন্তু এর নকশা দেখলে প্রথমেই মনে পড়ে ইসলামি ও মোগল স্থাপত্যের কথা। সারি সারি খিলান, উঁচু করিডর আর তামাটে রঙের গম্বুজ—সব মিলিয়ে ভবনটি যেন দক্ষিণ এশিয়ার কোনো পুরোনো দরবারের কথা মনে করিয়ে দেয়।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঘড়ির টাওয়ারটি যেন পুরো ভবনের প্রাণ। প্রায় ৪১ মিটার উঁচু সেই টাওয়ার দূর থেকেই চোখে পড়ে। শহরের আকাশে কাচের অট্টালিকার মাঝেও এই ঘড়ির টাওয়ার নিজের অস্তিত্ব স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়।
এই ভবনের সামনে বিস্তৃত সবুজ ময়দানটি মালয়েশিয়ার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে স্বাধীন মালয়েশিয়ার পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় একটি নতুন রাষ্ট্রের পথচলা।
আজও সন্ধ্যার সময় যখন বাতাস একটু ঠান্ডা হয়ে আসে, তখন অনেক মানুষ এখানে হাঁটতে আসে। কেউ ছবি তোলে, কেউ গল্প করে, কেউবা নিঃশব্দে বসে থাকে। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে সেই শতবর্ষী ভবন; সময়ের সব গল্প যেন তার ইট-পাথরের ভাঁজে জমা হয়ে আছে।
কুয়ালালামপুর এখন আধুনিকতার প্রতীক উঁচু টাওয়ার, ব্যস্ত রাস্তা, দ্রুতগতির জীবন। কিন্তু এই ভবনের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় সময় যেন একটু ধীরে চলে।
আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ, রাস্তার সাদা দাগের রেখা, আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গম্বুজওয়ালা সেই স্থাপনা সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন একধরনের নীরব সৌন্দর্য তৈরি করে। এমন মুহূর্তই আসলে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মনে হয়, আমরা শুধু একটি শহর দেখছি না বরং সেই শহরের অতীত, স্মৃতি আর ইতিহাসের সঙ্গে একটু সময় কাটাচ্ছি। সুলতান আবদুল সামাদ ভবন তেমনই একটি জায়গা যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, একটি শহরের ইতিহাস নীরবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
হয়তো সে কারণেই, কুয়ালালামপুরে কাটানো অসংখ্য মুহূর্তের ভিড়েও এই বিকেলটা আমার কাছে আলাদা হয়ে রয়ে গেছে।
দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা-১২০৪