কেন বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ির বিপ্লব প্রয়োজন

চীনে তৈরি বিওয়াইডি ইলেকট্রিক গাড়িরয়টার্সের ফাইল ছবি

কল্পনা করুন, ঢাকার রাস্তায় গাড়ির হর্ন আছে, যানজট আছে, কিন্তু ধোঁয়া নেই। জ্বালানির দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। এটা কোনো উপন্যাসের দৃশ্য নয়; এটাই হতে পারে আগামীর বাস্তবতা, যদি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা ইভির পথে হাঁটতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কাগজে-কলমের বিষয় নয়। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতির রাগ এখন ঘরের দরজায়। পরিবহন খাত বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমনের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব, বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিপ্লব।

বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রিক ভেহিকেল–ঝড়
সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মতো। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট ২ কোটি ৭ লাখের বেশি ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে; যা নতুন গাড়ির বাজারের ২৫ শতাংশের বেশি। মাত্র পাঁচ বছর আগে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ লাখ। একটি প্রযুক্তি এত দ্রুত মানুষের জীবনে ঢুকে পড়েছে, ইতিহাসে এমন নজির কম।

এই বিপ্লবের নেতৃত্বে রয়েছে চীন। ২০২৪ সালে চীনে বিক্রি হওয়া প্রতি দুটি গাড়ির মধ্যে একটি ছিল বৈদ্যুতিক। সড়কে চলা প্রতি দশটি গাড়ির একটি এখন ইভি। ইউরোপেও ছবিটা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। নরওয়েতে ২০২৪ সালে বিক্রি হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ গাড়িই ছিল ব্যাটারিচালিত, এটা রীতিমতো পৃথিবীর রেকর্ড। যুক্তরাজ্যে ২০২৫ সালে ইভির বাজার দখল ছিল ২৩ শতাংশের বেশি।

ইলেকট্রিক ভেহিকেল কেন এত জনপ্রিয়?
কারণ তিনটি: পরিবেশ, সাশ্রয় ও প্রযুক্তি। একটি ইভি তার পুরো জীবনকালে একটি পেট্রলচালিত গাড়ির তুলনায় অনেক কম কার্বন নির্গমন করে। চার্জিং খরচ জ্বালানির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আর ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতিতে দাম প্রতিবছর কমছে। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের রাস্তায় ২৪ কোটির বেশি ইলেকট্রিক ভেহিকেল থাকবে।

ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক
ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশ: সম্ভাবনার মাঝে সতর্ক পদক্ষেপ
বাংলাদেশের গল্পটা একটু ভিন্ন, কিন্তু মোটেই নিরুৎসাহজনক নয়। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশ আসলে অনেক আগেই ‘ইলেকট্রিক বিপ্লব’ শুরু করেছে, তবে সরকারি পরিকল্পনা ছাড়াই। সারা দেশেই লাখো ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলছে বছরের পর বছর। এটা ছিল তৃণমূল স্তরের একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব।

তবে আধুনিক ইভি বাজারের চিত্রটা এখনো ছোট। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ৬০ লাখের বেশি নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ৪০০টি চার চাকার ইভি নিবন্ধিত হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এই সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতি আশাব্যঞ্জক।

সরকারও নড়েচড়ে বসেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে শিল্প মন্ত্রণালয় ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫’ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এই নীতিতে থাকছে ইভি নিবন্ধন ফি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো, ২০৩০ সাল পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর মওকুফ এবং উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিকল্পনা করেছে, ২০৪০ সালের মধ্যে গণপরিবহনের ৮০ শতাংশ ও ২০৫০ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি বৈদ্যুতিক করতে।

আরও পড়ুন

চ্যালেঞ্জ: বাস্তবতার কঠিন মুখ
চার্জিং অবকাঠামো: বর্তমানে সারা দেশে মাত্র কয়েকটি পাবলিক ইভি চার্জিং স্টেশন রয়েছে, যা ৬০ লাখ যানবাহনের দেশের জন্য অপ্রতুল। তুলনায় দেশে প্রায় ৭৫৯টি বেশি পেট্রলপাম্প আছে। অথচ চার্জিং স্টেশন না থাকলে দূরের পথে ইভি চালানো প্রায় অসম্ভব।

উচ্চ মূল্য: চার চাকার ইভির আমদানি শুল্ক এখনো ৮৯ শতাংশ। এর ফলে একটি বিওয়াইডি গাড়ির দাম পড়ে যাচ্ছে কোটি টাকার কাছাকাছি; যা সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামো: লাখো গাড়ি চার্জ করতে হলে শক্তিশালী জাতীয় গ্রিড দরকার। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে; কিন্তু বিতরণ নেটওয়ার্ক এখনো লোডশেডিংমুক্ত নয়।

১৯৭২ সালে প্রথম ইলেকট্রিক কার তৈরি করে বিএমডব্লিউ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি
দ্য ডেইলি স্টারের একটি বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের বার্ষিক ব্যয় ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ইভির বিস্তার এই নির্ভরতা কমাতে পারে। পরিবেশগত দিক থেকে সরকার প্যারিস চুক্তির আওতায় পরিবহন খাতে ৩৪ লাখ টন কার্বন নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট যানবাহনের ৩০ শতাংশ ইভি করার লক্ষ্য ধরেছে।

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশি ও চীনা কোম্পানির মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা হয়েছে; যেখানে স্থানীয় ইভি সংযোজন কারখানা, ব্যাটারি উৎপাদন ও চার্জিং অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের পরিবহন খাতের আধুনিকায়নে সহায়তা করছে।

সৌরশক্তিচালিত চার্জিং স্টেশনের ধারণাটি বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ সারা বছর প্রচুর সূর্যালোক পায়। এই সুবিধা কাজে লাগানো গেলে পরিষ্কার বিদ্যুতে গাড়ি চলবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

ইতিহাস বলে, যে জাতি সময়মতো প্রযুক্তির রথে চড়তে পারে, সে এগিয়ে যায়। ইভি বিপ্লব এখন আর দূরের স্বপ্ন নয়, এটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতা। নরওয়ে একদিন পেট্রলের গাড়ি থেকে সরে এসেছে নীতি আর দৃঢ়তা দিয়ে। চীন হয়েছে বিশ্বের ইভি কারখানা। বাংলাদেশেরও সেই সুযোগ আছে।

প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়, সদিচ্ছার। চার্জিং স্টেশন বাড়াতে হবে, শুল্ক কমাতে হবে, গ্রিড শক্তিশালী করতে হবে। তার সঙ্গে দরকার একটি প্রজন্মের সচেতনতা ও উদ্যোক্তা মনোভাব। বাংলাদেশের রাস্তায় আর কতকাল ধোঁয়া উড়বে, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে বাংলাদেশে ইভির জনপ্রিয়টা দিন দিন বেড়েই চলছে।

শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি