মানুষ ০.৭ কী? মানবসভ্যতা কি টাইপ–২–তে পৌঁছাতে পারবে

ডাইসন স্ফিয়ারের কাল্পনিক কাঠামোছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে আমরা জেনারেশন বলতে বুঝি জেন–জি, জেন–আলফা বা মিলেনিয়াল; কোন জেনারেশন সেরা—এ নিয়ে বেশ তর্কবিতর্ক রয়েছে। এই তর্কের কোনো সমাধান না থাকলেও আমরা আসলে কোন সিভিলাইজেশন, এ সম্পর্কে কিন্তু বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত।

সিভিলাইজেশন সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন কারদাশেভ স্কেল। এটি মূলত একটি তত্ত্ব। সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাই কারদাশেভ তাঁর ‘ট্রান্সমিশন অব ইনফরমেশন বাই এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল সিভিলাইজেশনস’ নামের গবেষণাপত্রে এই স্কেল বিষয়ে ধারণা দেন। এটি মূলত রাশিয়ার ‘অ্যাস্ট্রোনমিচেস্কি জার্নাল’–এ প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ইংরেজি অনুবাদে সোভিয়েত অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কারদাশেভ মূলত কোনো সভ্যতার উন্নতির মাপকাঠিকে তারা কতটুকু শক্তি বা এনার্জি ব্যবহার করতে সক্ষম, তার ওপর ভিত্তি করে তিন ভাগে ভাগ করেন। এগুলো হলো—

টাইপ–১ সভ্যতা
একটি সভ্যতা যখন তার নিজস্ব গ্রহের (যেমন পৃথিবী) ওপর পড়া নক্ষত্রের সব শক্তি ও গ্রহের অভ্যন্তরীণ সব সম্পদ ব্যবহার করতে পারে, তখন তাকে টাইপ–১ বলে। এই সভ্যতার প্রাণী আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরি থামিয়ে দিতে পারে এবং সমুদ্রের তলদেশে বা মহাকাশে বড় শহর তৈরি করতে পারে।

টাইপ–২ সভ্যতা
এই স্তরের সভ্যতা তাদের পুরো নক্ষত্রের (যেমন সূর্য) উৎপাদিত মোট শক্তি সরাসরি সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে পারে। এরা অমরত্বের কাছাকাছি। কোনো গ্রহাণুর আঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদের ধ্বংস করতে পারবে না। সৌরজগতের যেকোনো গ্রহে এরা অনায়াসে বসবাস করতে পারবে।

টাইপ–৩ সভ্যতা
এটি একটি অতি উন্নত সভ্যতা, যা তাদের পুরো গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের (যেমন মিল্কিওয়ে) সব শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এদের কাছে কয়েক শ কোটি নক্ষত্রের শক্তি থাকবে। এরা সম্ভবত ওয়ার্মহোল ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে গ্যালাক্সির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করতে পারবে।

সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাই কারদাশেভ
ছবি: সংগৃহীত

কারদাশেভ তাঁর গবেষণাপত্রে এই তিন সভ্যতার ধারণা দেন। তবে তাঁর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা এই স্কেলকে আরও প্রসারিত করেছেন। টাইপ–৪ ও টাইপ–৫ সভ্যতার ধারণা মূলত মানুষের কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যায়।

টাইপ–৪ সভ্যতা
এটি হলো এমন এক পর্যায়, যেখানে একটি প্রজাতি বা সভ্যতা তাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্বের শক্তি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এরা মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের সব শক্তি ব্যবহার করে। এ ছাড়া মহাবিশ্বের প্রসারণ বা ডার্ক এনার্জি থেকেও শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে ভ্রমণ করতে পারে। তাদের কাছে স্থান ও সময় কোনো বাধা নয়। চাইলে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোলের ভেতরেও বসবাস করতে পারে। এই স্তরের প্রাণীরা সম্ভবত আর জৈবিক থাকবে না। তারা হয়তো ডিজিটাল বা বিশুদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত হবে, যারা মহাবিশ্বের ভৌত কাঠামো পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখবে।

টাইপ–৫ সভ্যতা
এটি কারদাশেভ স্কেলের সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে রহস্যময় স্তর। টাইপ–৫ সভ্যতা আমাদের মহাবিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে মাল্টিভার্স বা বহু মহাবিশ্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। এরা শুধু আমাদের মহাবিশ্ব নয়; বরং অগণিত সমান্তরাল মহাবিশ্বের শক্তি ব্যবহার করতে পারে। এদের ক্ষমতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। তারা নতুন মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারে, প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম (যেমন মহাকর্ষ বা আলোর গতি) পরিবর্তন করতে পারে এবং ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার মধ্যে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। এই সভ্যতা সময়ের ঊর্ধ্বে। তাদের কোনো জন্ম বা মৃত্যু নেই। কারণ, তারা মহাবিশ্বের শুরু ও শেষ—দুটিই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে।

এখন প্রশ্ন হলো, সভ্যতার এত ধারণার মধ্যে বর্তমানে আমরা কোন সভ্যতায় আছি
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকুর মতে, ‘আমরা বর্তমানে টাইপ ০.৭ পর্যায়ে আছি। অর্থাৎ টাইপ–১ থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছি। কারণ, আমরা আমাদের গ্রহ তথা পৃথিবীর ওপর পড়া নক্ষত্রের (সূর্যের) শক্তি ও সব সম্পদ ব্যবহার করতে পারলেও আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা, ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরি থামিয়ে দিতে পারা, সমুদ্রের তলদেশে বা মহাকাশে বড় শহর তৈরি করার মতো বিষয় এখনো আমাদের জন্য স্বপ্ন।’

তাহলে কি মানুষ কখনো টাইপ–২ সভ্যতায় পৌঁছাতে পারবে না
উত্তর হলো, পারবে। টাইপ–২–তে পৌঁছাতে হলে মানুষকে সূর্যের সব শক্তিকে ব্যবহার করতে জানতে হবে। এই শক্তি সংগ্রহের উপায় বলতে গিয়ে ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ–আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন ধারণা দেন ডাইসন স্ফিয়ারের। ডাইসন নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি এই ধারণার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ওলাফ স্ট্যাপলেডন নামক এক লেখকের ১৯৩৭ সালের সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস ‘স্টার মেকার’ থেকে।

কারদাশেভ স্কেল
ছবি: সংগৃহীত

এটি এমন একটি কাঠামো, যা সূর্যের চারপাশে থাকবে এবং সূর্যের শক্তি সংগ্রহ করবে। অনেকটা সূর্যের চারপাশে হাজার হাজার সোলার প্যানেল বা স্যাটেলাইটের একটি ঝাঁক বসিয়ে দেওয়ার মতো, যা ক্রমাগত ঘুরতে থাকবে এবং শক্তি সংগ্রহ করে পৃথিবীতে (বা অন্য গ্রহে) পাঠাবে।

মজার বিষয় হলো, পৃথিবীরই একটি কোম্পানি ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। কে বা কারা, এ নিয়ে আরেক দিন আলোচনা করব। তবে আপাতত এতটুকু মাথায় রাখা দরকার, সভ্যতার উচ্চস্তরে পৌঁছাতে গিয়ে আমরা যাতে নিজেদের ও পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের ক্ষতি না করে বসি।

দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা