একাডেমিক ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার চাপে যখন জীবন একঘেয়ে হয়ে ওঠে, তখন একটু প্রশান্তির খোঁজে প্রকৃতি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। তেমনই এক ডাকে সাড়া দিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের ২০২২–২০২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ফিচার কোর্সের অংশ হিসেবে জাকির স্যারের আহ্বানে বেরিয়ে পড়েছিলেন গ্রামবাংলার পথে। গন্তব্য ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার ত্রিবেণী ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রাম।
ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক থেকে কয়েকটি ভ্যানে করে যাত্রা শুরু করি। যত সামনে এগোচ্ছিলাম, ততই বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। আমরা গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্য চোখে দেখে লেখনির ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টায় ছিলাম। সবুজ প্রকৃতির না বলা গল্প তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। শ্রীরামপুরের কাঠের ব্রিজ নামে অধিক পরিচিত এই স্থান অবকাশযাপনের জন্য খুবই জনপ্রিয়। আশপাশের এলাকার প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ছাড়াও দূরদূরান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষেরাও এখানে আসেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খুব নিকটে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছেও এটি খুবই পরিচিত স্থান।
শ্রীরামপুর গ্রামে পৌঁছেই চোখে পড়ে সেই কাঠের ব্রিজ। কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি সেতুটি আধুনিক কোনো স্থাপনা নয়, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের স্পন্দন। ব্রিজটি গ্রামের দুই অংশকে একত্র করেছে। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে কালী নদী; শান্ত, ধীরগতি ও জীবন্ত। এই নদীতে কখনো দেখা যায় গরু–মহিষের পার হওয়ার দৃশ্য। মনে করিয়ে দেয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতার একটি পঙ্ক্তি।
‘পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।’
ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর নদীর মৃদু স্রোত মিলেমিশে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য তৈরি করে, যা দেখতে চিত্রকরের রঙের তুলিতে আঁকা ছবির মতো।
এই গ্রাম যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এক বাস্তব দৃষ্টান্ত। নদীর বুকে নৌকায় বসে জেলেরা মাছ ধরছে। কারও জাল ছুড়ে দেওয়ার দৃশ্য, কারও আবার জাল টেনে তোলার অপেক্ষা। আবার নদীর পাড়ে গোসল করার দৃশ্য। এসব দৃশ্য আমাদের কাছে নতুন নয়। তবে জীবনের জটিলতা ও ব্যস্ত সময়ে এই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
শীতের বিকেলে একটি দৃশ্য বিশেষভাবে নজর কাড়ে। খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য এক চাষির গাছে ওঠা, রসের হাঁড়িকে বাদুড় থেকে রক্ষার জন্য জাল বেঁধে রাখা। শীতকালে গ্রামীণ পরিবেশে এই দৃশ্য খুবই চোখে পড়ে। এটি আমাদের ঐতিহ্যও বটে। এই রস থেকেই তৈরি হয় খেজুরের গুড়, যা গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিচ থেকে সেই দৃশ্য দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম যে সাধারণ মানুষ সহজে রস পান করলেও এটির সংগ্রহের জন্য তত্ত্বাবধান করা খুব সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন অনেক শ্রম ও ধৈর্যের।
শ্রীরামপুর গ্রামের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এর নীরবতা। এখানে নেই যানজটের শব্দ, নেই হর্নের আওয়াজ। আছে শুধু পাখির ডাক, নদীর পানির কলতান আর বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি। এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয় যে প্রকৃতির পরশে মানুষের মন হয়ে ওঠে শান্ত। আর প্রকৃতির শব্দের ভেতর সুপ্তাবস্থায় নিহিত আছে পরম মমতা, নৈসর্গিক ভালোবাসা ও নব্য প্রেরণা। স্নিগ্ধ পরশ, নিখাদ অন্তর্দৃষ্টি ও পবিত্র স্পর্শানুভূতিতে মিশ্রিত এক স্বচ্ছ রূপ, যা কেবল রুষ্ট মনকে করে নিস্তেজ, পরিশ্রান্ত হৃদয়কে ছুঁয়ে দেয় শীতলতায় এবং উন্মনা মনকে করে তোলে আন্দোলিত। প্রকৃতির এই চিরায়ত পরার্থপরতার স্বভাব যেন স্বর্গীয় সুপ্ত বার্তার জানান দেয়, যা কেবলই গভীর অবলোকনের দ্বারাই মর্মপোলব্ধি করা সম্ভব।
জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এই ভ্রমণকে বলা যায় চলমান পাঠশালা। বইয়ে পড়া ফিচার আর বাস্তবে দেখে তা মনের কল্পনায় এনে লেখা আকাশ–পাতাল পার্থক্য। এখানে তথ্য শুধু চোখে দেখা নয়, অনুভবে ধরা পড়ে। এই ভ্রমণ শিখিয়েছে যে চোখে দেখা কোনো বাস্তব বিষয়কে লেখনির ভাষায় প্রতিটি বস্তুকে জীবন্ত করে তোলা যায়।
ফেরার পথে ভ্যানে বসে কারও মুখে ক্লান্তি ছিল না, ছিল একধরনের তৃপ্তি। মনে হচ্ছিল, এই কাঠের ব্রিজ, কালী নদী ও শ্রীরামপুর গ্রাম আমাদের ভেতরে একটি নীরব বার্তা দিয়েছে। কখনো ব্যস্ত জীবনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা মন কোনো কারণে ভারী হয়ে উঠলে চলে এসো প্রকৃতির এই কোলে। পরম মমতায় আগলে রাখবে এই সবুজ প্রান্তর।
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়