অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। রাত নেমে এসেছে নীরবে। আমরা কয়েকজন বেঙ্গল বইয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। দিনভর কাজের ক্লান্তি শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে, তবু মন অদ্ভুতভাবে হালকা। কথাবার্তা এলোমেলো, উদ্দেশ্যহীন; যেন হাঁটার মতোই, কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। ঠিক তখনই আড্ডার ফাঁকে কারও মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি কথা, চট্টগ্রামে যাওয়া যায় না?
প্রথমে কথাটাকে কেউই খুব গুরুত্ব দেয়নি। মনে হয়েছিল, এমন কথা তো আড্ডায় প্রায়ই ওঠে, মুহূর্তের উত্তেজনা, পরক্ষণেই ভুলে যাওয়ার মতো। কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে হাসিঠাট্টা আর কৌতুকের ভেতরেই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কথাটা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্তে রূপ নেয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমরা সত্যিই চট্টগ্রামে যাচ্ছি।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল না কোনো যুক্তি, আর না ছিল কোনো বড় কারণ। ছিল না ছুটি, ছিল না আগাম কোনো প্রস্তুতি। ছিল কেবল একঘেয়ে রুটিন থেকে বেরিয়ে আসার একরাশ তাগিদ, আর একসঙ্গে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার নীরব ইচ্ছা।
যাত্রার শুরু
রাত সাড়ে ১১টায় কলাবাগান কাউন্টার থেকে শ্যামলী পরিবহনের টিকিট কাটা হলো। বাস ছাড়বে সায়দাবাদ থেকে। কলাবাগান থেকে শ্যামলীরই একটি সিলেটগামী বাসে উঠে আমরা সায়দাবাদের পথে রওনা দিলাম। রাজধানীর রাত তখনো পুরোপুরি ঘুমায়নি। রাস্তার ভিড়, গাড়ির হর্ন, জানালার বাইরে ছুটে চলা আলোর রেখা—সব মিলিয়ে শহরটা যেন ক্লান্ত চোখে জেগে ছিল।
রাত ১২টার বাস। অতিরিক্ত ট্রাফিকের কারণে সায়দাবাদ পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দেড়টা বেজে যায়। এর মধ্যে বারবার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি বাসটা মিস হয়ে গেল, এই বুঝি সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। প্রতিটা মিনিট বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়াচ্ছিল। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পা রেখেই চোখে পড়ল অবিশ্বাস্য দৃশ্য, আমাদের মূল বাসটি তখনো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই মুহূর্তে অজান্তেই সবার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে।
সায়দাবাদ পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগেই যাত্রাপথে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে আমাদের দলের একজনের ফোন ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। মুহূর্তের সতর্কতায় বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনাটা সবাইকে কিছুটা নাড়িয়ে দেয়। বাস্তবতা হঠাৎ করেই মনে করিয়ে দেয়, এই শহর যেমন আলোয় ভরা, তেমনি অন্ধকারেও।
তবু বিচলিত না হয়ে আমরা বাসে উঠে পড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ছুটতে শুরু করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে। গভীর অন্ধকারে বাসের ভেতরে ধীরে ধীরে নেমে আসে নীরবতা। কেউ ঘুমিয়ে পড়ে, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। ভাবনার ভেতর তখনো ভেসে থাকে হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্ত।
ভোরের আলো ফুটতেই জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে শুরু করে। অচেনা পথ, নতুন আলো, অন্য রকম বাতাস—সব মিলিয়ে একটা নতুন দিনের জন্ম হয়, আমরা পৌঁছে যাই চট্টগ্রামে। বাস থেকে নেমে কাছের একটি রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতা সেরে নিই। রাত জাগার ক্লান্তি আর গরম নাশতার প্লেট—সব মিলিয়ে শরীরে আবার নতুন করে শক্তি ফিরে আসে।
নাশতার পর বসে পড়ি পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করতে। বিস্তর আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় শুরুতে বাঁশখালী ইকোপার্ক, তারপর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত।
বাঁশখালী ইকোপার্ক
প্রথম গন্তব্য বাঁশখালী। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে একটি সিএনজি নিয়ে কাছের বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখান থেকে লোকাল বাসে শুরু হয় যাত্রা। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যত এগোই, চারপাশ তত বদলে যেতে থাকে। কংক্রিটের দালান হারিয়ে যায়, জায়গা নেয় খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ আর গাছপালা। জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, ভ্রমণটা শুধু বাইরের পথেই নয়, আমাদের ভেতরেও চলছে।
বাঁশখালী পৌঁছে বাস থেকে নেমে দুটি রিকশা নিয়ে ইকোপার্কের পথে যাই। রিকশার ধীরগতিতে পাহাড়ি পথ পেরোনোর সময় প্রকৃতিকে যেন আরও কাছ থেকে অনুভব করা যাচ্ছিল।
বাঁশখালী ইকোপার্ক পাহাড়, বন আর জলাশয়ের এক অনবদ্য মেলবন্ধন। প্রবেশমূল্য প্রত্যেকজনের জন্য ৫০ টাকা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ঘন সবুজ বন, উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ, শান্ত জলের লেক আর লেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো ঝুলন্ত সেতু। বাতাসে পাতার গন্ধ, দূরে পাখির ডাক। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে এসে সময়টা যেন একটু থমকে দাঁড়ায়।
কেউ ছবি তুলছে, কেউ নিরিবিলি বসে আছে, কেউ আবার উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এসবের মধ্যে ঘন সবুজ পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের শান্ত লেকে ভেসে বেড়ানো হাজারো অতিথি পাখির দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। দেখতে দেখতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেল, টেরই পাওয়া গেল না।
পার্ক থেকে বের হয়ে স্থানীয় একটি দোকানে দুপুরের খাবার খাই। সাধারণ ভাত–ডাল, কিন্তু দীর্ঘ হাঁটার পর এই সাধারণ খাবারটাই আলাদা তৃপ্তি দেয়। এরপর পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার পালা।
বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত
এবারের গন্তব্য বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত। একটি সিএনজি রিজার্ভ করে আমরা বাহারছড়ার উদ্দেশে রওনা দিই।
সমুদ্রের পথে আবারও বিড়ম্বনা। চলন্ত সিএনজির একটি টায়ার হঠাৎ পাংচার হয়ে যায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা, গাড়ি থেকে যন্ত্রপাতি ও নতুন টায়ার বের করে চালকের টায়ার পরিবর্তনের চেষ্টা—সব মিলিয়ে সময় নষ্ট হলেও কেউ বিরক্ত হয়নি। এই ছোটখাটো ঝামেলাগুলোই যেন ভ্রমণকে আরও বাস্তব করে তোলে।
বিকেলের দিকে আমরা পৌঁছে যাই বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতে। এখানে সমুদ্রের চেহারা আলাদা। কক্সবাজারের মতো ভিড় নেই, দোকানপাট কম, চারপাশে একধরনের নীরব শান্তি। শুরুতে ভাটা থাকলেও ধীরে ধীরে জোয়ারে ভরে ওঠে সমুদ্র। বিস্তৃত বালুচর, ঢেউয়ের একটানা শব্দ আর দূরের নীল জলরাশি—সব মিলিয়ে সৌন্দর্যটা নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। আমরা কেউ হাঁটি, কেউ বসে থাকি, কেউ আবার চুপচাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাই। মনে হচ্ছিল, মুহূর্তগুলো সহজে ভুলে যাওয়া যাবে না।
সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের রং বদলায়। আলো ফুরিয়ে আসে, বাতাস ঠান্ডা হয়ে ওঠে। সমুদ্রের ধারে বসে ঢেউ আর নীল জলরাশির মাঝে সূর্যাস্ত দেখা, এই সময়টুকু যেন পুরো দিনের ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়।
ফেরার পথে
সমুদ্র দেখা শেষ। চোখের পলকে একটি দিন কেটে যায়। এবার ফেরার পালা। সন্ধ্যার পর ফেরার কোনো আগাম প্রস্তুতি ছিল না। সমুদ্র থেকে একটা সিএনজি নিয়ে আমরা আবার চট্টগ্রাম শহরগামী বাসস্ট্যান্ডে ফিরি। সেখানে গিয়ে শুরু হয় নতুন সমস্যা, বেশির ভাগ বাসের টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। কোনো বাসেই সিট নেই। অপেক্ষা করতে করতে সময় গড়াতে থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষমেশ একটি বাস পাওয়া যায়। শুরু হয় ফেরার যাত্রা।
যাত্রা শুরু হলেও ঝামেলা পিছু ছাড়ে না। কিছু দূর যাওয়ার পর বাসের টায়ারে সমস্যা দেখা দেয়। রাস্তার পাশে থেমে টায়ার বদলাতে হয়। এর মধ্যেই চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়, বাতাসে তীব্র শীত। বাসের ভেতর সবাই নীরব, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে, কেউ ক্লান্ত চোখে বসে, কেউ ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত ১০টার দিকে আমরা আবার চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাই। বাস থেকে নেমে রাতের খাবার খাই। শরীর ক্লান্ত হলেও মনটা ছিল ভরা। এরপর দুবার সিএনজি বদলে ঢাকাগামী বাসস্ট্যান্ডে যাই। রাত ১২টা ৪৫ মিনিটের টিকিট কেটে শুরু হয় আমাদের ঢাকায় ফেরার যাত্রা।
এই ভ্রমণ কোনো পরিকল্পনার ফল ছিল না। তবু এই এক দিনের যাত্রা আমাদের জন্য হয়ে উঠেছে আজীবনের স্মৃতি। হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত, পথে পাওয়া বিড়ম্বনা, পাহাড়ের সবুজ আর সমুদ্রের নীল—সব মিলিয়ে দিনটা ছিল অসম্ভব সুন্দর। হয়তো জীবনে আর কখনো ঠিক এমনভাবে, ঠিক এমন দিনে চট্টগ্রামে যাওয়া হবে না। কিন্তু এই যাত্রা, এই এক দিন, চিরকাল আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে।
সহসভাপতি, রাজশাহী বন্ধুসভা