পাখিরা কেন অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে বাসা বানাচ্ছে

অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখির বাসাছবি: রয়টার্স

চিরাচরিত প্রাকৃতিক নিয়মে আমরা দেখতে পাই, পাখিরা সাধারণত বাসা তৈরিতে যেসব উপাদান ব্যবহার করে, এর মধ্যে প্রধান হলো খড়কুটো, লতা, গাছের পাতা, শুকনা ঘাস, গাছের ডাল কিংবা আঁশ। তবে প্রকৃতির এই চিরচেনা রূপকে বদলে দিয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি।

যুদ্ধ পরিবেশের জন্য কখনোই কল্যাণকর হয়ে আসে না। এরই স্পষ্ট ছাপ যেন ফুটে উঠেছে এই ব্যতিক্রমী ঘটনার মধ্যে, যেখানে দেখা গেছে, ইউক্রেনে পাখিরা প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর পরিবর্তে বাসা বানাচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে! ইউক্রেনে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনের কাছে দেখা গেছে এমন অনেক পাখির বাসা। ওই সব এলাকা অসংখ্য অপটিক ফাইবার দিয়ে ছেয়ে রয়েছে, যা দিয়ে সেনারা তাঁদের যুদ্ধ ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করে।

অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখির বাসা
ছবি: রয়টার্স

এই ড্রোন নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক কমান্ড সেন্টারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখতে পুরো এলাকায় মাটির ওপর দিয়ে গাছে গাছে বা অস্থায়ীভাবে মাইলের পর মাইল অপটিক্যাল ফাইবার লাইনের নেটওয়ার্ক বিছানো হয়েছে। এর একটা বড় অংশ অনবরত বোমাবর্ষণ বা আক্রমণের শিকার হয়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। যেহেতু পুরো অঞ্চলেই ফাইবারের ছড়াছড়ি, তাই পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক খড়কুটোর চেয়ে এই পরিত্যক্ত তারগুলো সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে গেছে।

১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের প্রবর্তিত অভিযোজন তত্ত্ব (থিওরি অব অ্যাডাপ্টেশন) অনুসারে, যদি কোনো জীব তার পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তবেই সে টিকে থাকে। ইউক্রেনের পাখিদের অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে বাসা বানানোর ঘটনাটি ডারউইনের এই তত্ত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পাখিদের একধরনের ‘শহুরে অভিযোজন (আরবান অ্যাডাপ্টেশন)’। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে এই এলাকাগুলোতে পাখিদের বাসা বানানোর জন্য যখন প্রাকৃতিক উপাদানের অভাব দেখা দিয়েছে, তখন তারা চারপাশের সহজলভ্য উপাদানটি বেছে নিয়েছে নিজেদের বাসস্থান বানানোর জন্য।

অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখির বাসা
ছবি: রয়টার্স

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রযুক্তির বর্জ্য দিয়ে পাখির বাসা বানানোর এই প্রবণতা কিন্তু একেবারে নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের ট্রেঞ্চগুলোতে যোগাযোগের জন্য মাইলের পর মাইল সামরিক টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের তামার তার বিছানো হয়েছিল। তৎকালীন বিভিন্ন সামরিক ডায়েরি ও পরবর্তীকালের গবেষণায় দেখা গেছে, বোমাবর্ষণে বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট সেই তামার তারের বর্জ্য দিয়ে বিশেষ কিছু প্রজাতির পাখি (যেমন আমেরিকান রবিন পাখি) বাসা বানিয়েছিল।

এ ছাড়া বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বিভিন্ন দেশের সামরিক রাডার স্টেশন ও সিগন্যাল টাওয়ারের আশপাশে তারের বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। চিলির কিছু অঞ্চলে কোয়াটকারো (কাঠঠোকরার প্রজাতি) নামক পাখি এবং ইউরোপের কিছু অঞ্চলের নাইটিঙ্গেল (বুলবুলি) পাখি সামরিক ক্যাম্পের পরিত্যক্ত নাইলন ও ফাইবার গ্লাসের তার দিয়ে বাসা বানাতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মানুষের ধ্বংসলীলার মধ্যে প্রকৃতির বেঁচে থাকার লড়াইটা আদিমকাল থেকেই চলমান।

তবে অভিযোজনের মাধ্যমে পাখিরা নিজেদের বাসা কৃত্রিম উপাদানের সাহায্যে বানিয়ে ফেললেও এতে লুকিয়ে আছে মানবসমাজের ধ্বংসাত্মক রূপ, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতির কারণ। পাখিদের জন্য এই বাসাগুলো হয়ে উঠতে পারে একটি মরণফাঁদ। অপটিক্যাল ফাইবারের ভেতরের অংশটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সিলিকা বা কাচের তন্তু দিয়ে তৈরি হওয়ায় এগুলো ছানাদের চোখ ও শরীরে ফুটে মারাত্মক অভ্যন্তরীণ ক্ষত তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন
অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখির বাসা
ছবি: রয়টার্স

এ ছাড়া প্রাকৃতিক উপাদান না হওয়ায় এই বাসাগুলো প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না। ফলে তীব্র শীতে এটি বরফের মতো ঠান্ডা এবং গরমে উত্তপ্ত হয়ে ডিম ও বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে জট পাকানো এই কৃত্রিম তারের ফাঁদে ডানা বা পা আটকে বহু পাখি বাসা থেকে বের হতে না পেরে না খেয়ে বা শ্বাসরোধ হয়ে মারা যেতে পারে। কেব্‌লের প্লাস্টিক আবরণ মুখে নেওয়ার কারণে তাদের শরীরে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পাখিদের প্রজননক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারে!

অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখিদের এই বাসাগুলো মানবসৃষ্ট আগ্রাসনের এক নীরব দলিল। মানুষের যুদ্ধ কীভাবে বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আচরণকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এটি তারই এক উদ্বেগজনক প্রমাণ। তাই প্রকৃতির এই সংকট মোকাবিলায় এখনই আমাদের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ