মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের এই ছবিই কি খুঁজে দেবে নতুন পৃথিবী

ইনফোগ্রাফিক: ইউক্লিডের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রীয় অঞ্চল জরিপছবি: ইএসএ/ইউক্লিড/ইউক্লিড কনসোর্টিয়াম/নাসা

রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা যেসব নক্ষত্র দেখি, সেগুলো আসলে এক বিশাল মহাজাগতিক গল্পের ক্ষুদ্র অংশ। সেই গল্পের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানোর স্বপ্ন বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের। এবার সে স্বপ্নকে আরও বাস্তব করে তুলেছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইউক্লিড টেলিস্কোপ।

সম্প্রতি ইউক্লিড টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের এমন একটি ছবি ধারণ করেছে, যেখানে ছয় কোটির বেশি নক্ষত্রকে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, ছবিটির গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর সূক্ষ্মতায়। এত ঘনবসতিপূর্ণ নক্ষত্ররাজির মধ্যেও পৃথক পৃথক নক্ষত্রকে শনাক্ত করতে পেরেছে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এমন ছবি কেবল সৌন্দর্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ভবিষ্যতের বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরও ভিত্তি হতে পারে।

‘আকাশভরা সূর্য–তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’—রবীন্দ্রনাথের এ পঙ্‌ক্তি যেন নতুন অর্থে ফিরে আসে ইউক্লিডের পাঠানো ছবির দিকে তাকালে। কারণ, এ ছবিতে শুধু তারা নেই, আছে অজানা পৃথিবীর সম্ভাবনা, আছে মহাবিশ্বকে বোঝার নতুন সূত্র।

ইউক্লিডের চোখে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চল
ছবি: ইএসএ/ইউক্লিড/ইউক্লিড কনসোর্টিয়াম/নাসা

মূলত ইউক্লিড টেলিস্কোপ নির্মাণ করা হয়েছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় দুই উপাদান ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি অনুসন্ধানের জন্য। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আমাদের পরিচিত পদার্থ মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ। বাকিটাজুড়ে রয়েছে অদৃশ্য ও অজানা শক্তি, যার আচরণ এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।

২০২৩ সালে উৎক্ষেপিত প্রায় এক বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ের এ মহাকাশযান সেই রহস্যের খোঁজে কাজ করছে। তবে গবেষণার পথে চলতে গিয়ে এটি আরেকটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে—এক্সোপ্ল্যানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ অনুসন্ধান।

গত বছরের মার্চ মাসে টানা ২৬ ঘণ্টা মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের দিকে নজর রেখেছিল ইউক্লিড। নয়টি পৃথক পর্যবেক্ষণ একত্র করে তৈরি করা হয় এ বিশাল চিত্র। প্রতিটি পর্যবেক্ষণ আকাশের এমন একটি অঞ্চলকে ধারণ করেছে, যার বিস্তৃতি পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে বড়।
বিজ্ঞানীদের কাছে ছবিটির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, এটি ভবিষ্যতের গ্রহ অনুসন্ধানকে আরও নির্ভুল করে তুলবে।

আরও পড়ুন
ইউক্লিডের গ্যালাকটিক বাল্জ জরিপের অবস্থান
ছবি: ইএসএ/ইউক্লিড/ইউক্লিড কনসোর্টিয়াম/নাসা

বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন কৌশলে দূরবর্তী নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহ শনাক্ত করেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতি। যখন একটি নক্ষত্র আরেকটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে চলে আসে, তখন তার মহাকর্ষ পেছনের নক্ষত্রের আলোকে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল করে তোলে। সে প্রক্রিয়ায় কোনো গ্রহের উপস্থিতি থাকলে আলোর পরিবর্তনে বিশেষ সংকেত তৈরি হয়।

কিন্তু এ সংকেত বিশ্লেষণ সব সময় সহজ নয়। নক্ষত্রগুলোর অবস্থান ও গতি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্যের প্রয়োজন হয়। ইউক্লিডের নতুন ছবি সেই কাজকেই অনেক সহজ করে দিয়েছে।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ড. ইমন কেরিনসের মতে, এ তথ্য ভবিষ্যতের গবেষণাকে নতুন গতি দেবে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা প্রায় ছয় হাজার এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও আগামী দিনে এ সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইউক্লিডের চোখে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চল
ছবি: ইএসএ/ইউক্লিড/ইউক্লিড কনসোর্টিয়াম/নাসা

এদিকে আগামী আগস্টে নাসা উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। বিজ্ঞানীদের আশা, এটি মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে প্রায় দেড় হাজার নতুন গ্রহের সন্ধান দেবে এবং অন্য পদ্ধতিতে আরও এক লাখ সম্ভাব্য গ্রহ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

ইউক্লিডের তথ্য সেই অনুসন্ধানকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে। ফলে বিজ্ঞানীরা সহজেই বুঝতে পারবেন, কোনো সংকেত সত্যিই একটি গ্রহের উপস্থিতি নির্দেশ করছে, নাকি সেটি অন্য কোনো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার ফল।

মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অনেক ছবি এসেছে, অনেক ছবি বিস্মিত করেছে। কিন্তু কিছু ছবি শুধু চোখকে নয়, চিন্তাকেও প্রসারিত করে। ইউক্লিডের তোলা ছবিটি তেমনই এক ছবি। কারণ, এখানে আমরা শুধু ছয় কোটি নক্ষত্র দেখি না; দেখি অজানা পৃথিবীর সম্ভাবনা, দেখি মহাবিশ্বের অন্ধকার রহস্যের দিকে খোলা নতুন জানালা। হয়তো এই জানালার ওপারেই অপেক্ষা করছে এমন সব আবিষ্কার, যা মানুষের মহাবিশ্ব-সম্পর্কিত ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: নাসা, দ্য গার্ডিয়ান

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা