কৃষকের খাবার থেকে ঐতিহ্যের আসনে—কালাই রুটির গল্প কতটা জানেন

কালাই রুটির আসল স্বাদ মাটির চুলায়ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বাংলাদেশের মানচিত্রের একদম পশ্চিমের শেষ সীমানায়, যেখানে মহানন্দা আর পদ্মা এসে হাত মিলিয়েছে, সেই প্রাচীন জনপদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ধূসর মাটির এই বরেন্দ্র অঞ্চল মানেই দিগন্তজোড়া আমের বাগান, শত বছরের প্রাচীন কাঁসাশিল্প আর গম্ভীরার তালের সঙ্গে মিশে থাকা লোকজ ঐতিহ্য। এই জনপদের মানুষের রুক্ষ মাটির সঙ্গে লড়াই করার যেমন ধৈর্য আছে, তেমনি আছে রসনাবিলাসের এক নিজস্ব এবং আদিম ইতিহাস। সেই লোকজ স্বাদের কথা স্মরণ করতে গেলে সবার আগে উঠে আসে মাটির সোঁদা গন্ধ মাখা মাষকলাইয়ের ‘কালাই রুটি’র নাম।

কালাই রুটি কিন্তু এক দিনেই ঐতিহ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি। অভাব থেকে ঐতিহ্যে কালাই রুটির এই জয়যাত্রা কোনো রাজকীয় হেঁশেল থেকেও শুরু হয়নি। এর জন্ম হয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের সাধারণ মেহনতি মানুষের ঘরে, দারিদ্র্য আর কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

আরও পড়ুন

একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই রুক্ষ বরেন্দ্র অঞ্চলে ধান চাষ করা ছিল বেশ কঠিন। কিন্তু এই মাটিতে মাষকলাই ডাল আর আতপ চাল চাষ হতো প্রচুর। মাঠে কৃষকেরা যখন দীর্ঘ সময় রোদে পুড়ে কাজ করতেন, তখন তাঁদের এমন একটি খাবারের প্রয়োজন হতো, যা দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকে এবং শরীরকে পর্যাপ্ত শক্তি দেয়। সাধারণ গমের রুটি বা ভাত যেখানে খুব দ্রুত হজম হয়ে যেত, সেখানে মাষকলাই আর চালের গুঁড়ার এই শক্ত রুটি তাঁদের সারা দিন কাজ করার শক্তি জোগাত। তখন সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল ‘গরিবের খাবার’। তবে বর্তমান সময়ে এই কালাই রুটি আয়েশ করেই খাওয়া হয় এবং এটি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

কালাই রুটি তৈরি করা এক নিপুণ শিল্প। এই রুটি তৈরির প্রধান শর্ত হলো সঠিক মিশ্রণ। সাধারণত তিন ভাগ চালের গুঁড়ার সঙ্গে এক ভাগ মাষকলাইয়ের আটা মেশানো হয়। এরপর সামান্য লবণ ও পানি দিয়ে মণ্ড বা খামির তৈরি করা হয়। খামিরটি হতে হয় একদম সঠিক—খুব বেশি শক্তও নয়, আবার খুব বেশি নরমও নয়।

কালাই রুটি ও ভর্তা

এর পরেই আসল কারুকার্য শুরু হয়। সাধারণত গমের রুটি বেলন-চাকির সাহায্যে তৈরি করা হয়, কিন্তু কালাই রুটি তৈরি করা হয় কারিগরের হাতের তালুর সাহায্যে। খামির থেকে ছোট একটি গোল্লা নিয়ে দুই হাতের তালু দিয়ে চাপ দিতে দিতে সঠিক পদ্ধতিতে এই রুটি বানানো হয়। এভাবে রুটিটি ধীরে ধীরে বড়, গোলাকার ও পাতলা হয়ে আসে।

এরপর আসে রুটি সেঁকার পালা। রুটির আসল স্বাদ পাওয়ার জন্য মাটির চুলার প্রয়োজন। গ্যাসের চুলা বা আধুনিক ম্যাজিক চুলাতে কালাই রুটির আসল স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। আবার এটি সেঁকা হয় একটি বিশেষ পাত্রে, যার নাম ‘খোলা’। উনুনে কাঠের আগুনের তাপে রুটিটি ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে এবং বাদামি বর্ণ ধারণ করে। তখনই এটি সম্পূর্ণ খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এই রুটির যে সোঁদা গন্ধ বের হয়, এতেই বোঝা যায়—এটি একটি অনন্য খাবার।

রুটি তো তৈরি হলো, এবার আসে স্বাদ গ্রহণের পর্ব। কালাই রুটি সাধারণত পরিবেশন করা হয় বেগুনের ভর্তা, বিভিন্ন মাংসের ঝোল, পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে তৈরি ভর্তা, ধনেপাতার চাটনি ইত্যাদির সঙ্গে। এ ছাড়া কালাই রুটি হাঁসের মাংস দিয়ে খাওয়ারও বিশেষ নজির রয়েছে। এটি সারা বছরই খাওয়া হয়; তবে শীতের সময় খাওয়ার ধুম বেশি পড়ে। শীতকালের নতুন বেগুনের ভর্তা আর ধনেপাতার চাটনি দিয়ে এই রুটি খাওয়ার স্বাদই আলাদা। ভাবলেই জিভে জল চলে আসে। তা ছাড়া শীতের কুয়াশা আর ধোঁয়া ওঠা রুটির ঘ্রাণে যখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসে, তখন যেন এক অন্য রকম উৎসবের আমেজ নামে।

বর্তমান সময়ে কালাই রুটি কেবল ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর হাত ধরে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর অলিগলি, ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় রেস্তোরাঁয়ও এর স্বাদ ছড়িয়ে পড়েছে। শত শত নারী-পুরুষ রাস্তার ধারে মাটির উনুন জ্বালিয়ে বসছেন। এ থেকেই তাঁরা আয়–রোজগার করছেন। হাতের তালুর সাহায্যে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটির মধ্যেই জমে আছে কত শত জীবনের গল্প, ঘাম আর সংগ্রামের ইতিহাস। এভাবেই মানুষের হাত ধরে এই ঐতিহ্য টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া