ভ্রমণ
হোয়াংনিয়ংসানে আলোময় বুসানের রাত
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
বুসান মানেই সমুদ্রতীর, সৈকতের ঢেউ আর আধুনিক শহরের ঝলমলে আলো। কিন্তু বুসানের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে হলে দৃষ্টি দিতে হবে তার পাহাড়চূড়ায়। অসংখ্য পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে বুসানের বুক চিরে। হোয়াংনিয়ংসান (Hwangnyeongsan) হলো সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রায় ৪২৭ মিটার উঁচু এ পাহাড় থেকে পুরো শহর যেমন দেখা যায়, তেমনি চারপাশ ঘিরে থাকা সমুদ্রেরও দেখা মেলে। তাই এখানে দাঁড়িয়ে কারও পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন হবে না যে বুসান কেবল বন্দরনগরী নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আধুনিকতারও মেলবন্ধন।
রাতের যাত্রা আর পাহাড়ের অভিজ্ঞতা
রাত একটায় আমরা চারজন — এক বন্ধু, দুই ভাই আর আমি স্পোর্টস কারে চড়ে রওনা দিলাম। বুসানের ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এল, শহরের আলো মিলিয়ে গেল পেছনে। সামনে শুরু হলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। প্রতিটি বাঁক আমাদের কাছে নতুন উত্তেজনা নিয়ে আসছিল— মনে হচ্ছিল আকাশ ছুঁতে স্বর্গের কোনো পথ ধরে উঠে যাচ্ছি।
পুকিয়ং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ট্যাক্সি কিংবা গাড়িতে করে গেলে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় পাহাড়ের পাদদেশে। তবে আসল অভিজ্ঞতা শুরু হয় গাড়ি পার্কিংয়ের পর। যখন খাড়া পথ ধরে হাঁটতে হয় চূড়ার দিকে। তাই হাঁপিয়ে গেলেও ওপরে কী দৃশ্য অপেক্ষা করছে, এই ভাবনায় ভেতরে-ভেতরে কৌতূহল কাজ করছিল।
চূড়ায় পৌঁছে অবাক হলাম, শুধু আমরা নই, আরও অনেক তরুণ-তরুণী এসেছেন নানা দেশ থেকে—উজবেকিস্তান, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সঙ্গে স্থানীয় কোরিয়ানরাও। ভাষা আলাদা হলেও সবাই মিলে আলোয় ভরা শহরের সামনে দাঁড়িয়ে এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়লাম। হাসি আর গল্পে রাতটা হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের উৎসব।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া
হোয়াংনিয়ংসান কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি কোরিয়ার অতীতের সাক্ষীও। সিলা রাজবংশের (খ্রিষ্টীয় পঞ্চম থেকে নবম শতক) সময় পাহাড়ের চূড়ায় ছিল বিখ্যাত বিকন ফায়ার স্টেশন। আগুন জ্বালিয়ে এখান থেকে শত্রুর আক্রমণের সংকেত পাঠানো হতো দূরের পাহাড়ে, আর সেখান থেকে রাজধানীতে। আজও সেই নিদর্শন পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। যা যুদ্ধকালের ইতিহাস ও যোগাযোগকৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে এখানে আধুনিক বুসানেরও দেখা মেলে। পাহাড়চূড়ায় বিশাল টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার ঘিরে রয়েছে ক্যাফে আর আড্ডার জায়গা। স্থানীয় তরুণদের কেউ যেমন রাতের আলো দেখতে আসেন, তেমনি কেউ আসেন গিটার বাজাতে কিংবা স্রেফ নির্মল বাতাস উপভোগ করতে। বুসানের আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোর সময় পাহাড়ে ভিড় জমে আর রাতজাগা মানুষদের জন্য এটি হয়ে ওঠে স্বপ্নের ঠিকানা।
আলোময় শহর আর জীবনের শিক্ষা
ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যখন চোখ মেললাম, তখন বিস্তৃত বুসান যেন একসঙ্গে ধরা দিল—সমুদ্রতীরজুড়ে ঝলমলে গওয়াঙ্গান ব্রিজ, পাহাড়ের গায়ে সাজানো অসংখ্য ঘরবাড়ি, দূরে ছড়িয়ে থাকা আকাশচুম্বী ভবন—সব মিলিয়ে এক বিশাল ক্যানভাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি মনে হচ্ছিল।
আলোময় শহরের আতিথেয়তায় খাড়া পথে হাঁটার কষ্ট, শ্বাসকষ্ট—সব মুহূর্তেই মুছে গেল। মনে হলো জীবনও অনেকটা এই রকম। শীর্ষে পৌঁছাতে পরিশ্রম লাগে, পথ কষ্টকর হয়; কিন্তু একবার শীর্ষে পৌঁছাতে পারলে তখন পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।
হোয়াংনিয়ংসান আমার কাছে কেবল একটি পাহাড় নয়। বোধ করি, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধুনিকতা আর জীবনের পাঠ একসঙ্গে শেখায়। রাতের আকাশ, ঠান্ডা হাওয়া, আলোয় ভরা শহর আর অচেনা মানুষের বন্ধুত্ব—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে, বন্ধুর পথ পেরোলেই আলোর দেখা মেলে।
বুসান, দক্ষিণ কোরিয়া