ঢেউয়ের কাছে রেখে আসি মন

কুয়াকাটা আমাকে বারবার ডাকে।

ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলাম গত ২৩ মে। ঢাকার যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি বেশ ভারী লাগছিল। প্রতিদিন একই রাস্তা, একই ব্যস্ততা। মনটা যেন খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ছটফট করছিল। আমি ও বন্ধু বায়েজীদ পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকি; ছুটি পেলে তবেই বাড়িতে ফেরার সুযোগ মেলে।

বাড়িতে এসেই বন্ধুর সঙ্গে পরিকল্পনা করলাম, এই ছুটিতেই কুয়াকাটায় যেতে হবে। দুর্লভ ছুটিটা শুধু ঘরে বসে নষ্ট করতে মন চাইল না। ২৫ মে ভোরবেলা দুই বন্ধু রওনা দিলাম কুয়াকাটার উদ্দেশে। বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত হালকা অনুভূতি।

এটা আমার পঞ্চমবার কুয়াকাটায় যাওয়া। বাড়ি বরিশালে হওয়ায় সুবিধাটা একটু বেশি—মাত্র তিন ঘণ্টার পথ, মন চাইলেই ছুটে যাওয়া যায়। তবু প্রতিবারই মনে এক অদ্ভুত টান অনুভব করি। কুয়াকাটা আমাকে বারবার ডাকে। আমিও সে ডাকে সাড়া দিই, নিঃসংকোচে।

বন্ধু বায়েজীদের সঙ্গে।

সকালে পৌঁছেই হোটেলে ব্যাগ রেখে, সোজা চলে গেলাম সৈকতে। ঢেউয়ের শব্দ কানে আসতেই মনটা নিমেষে হালকা হয়ে গেল; যেন সমুদ্র নিজেই বলছে, এসো, একটু দম নাও। বালুর ওপর পা রাখতেই ভেতরে প্রশান্তি নেমে এল। সমুদ্রের পাড়ে শুয়ে-বসে সময় কাটাব, কোনো তাড়া নেই, কোনো গন্তব্য নেই— শুধু শান্তি অনুভব করা, আর সেটাই করলাম।

সমুদ্রবিলাসের পর দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে রাতে আবার গেলাম সৈকতে। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে আমি আর বায়েজীদ মেতে উঠলাম অবিরাম আড্ডায়। জীবনের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত হাসি—সব একসঙ্গে ভেসে উঠল যেন। আড্ডা শেষই হতে চাইছিল না আর সমুদ্রও যেন মনোযোগ দিয়ে শুনছিল আমাদের সব কথা।

চাঁদের আলোয় সমুদ্রের গর্জন শুনতে অদ্ভুত ভালো লাগে।

পরদিন ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতেই ছুটলাম গঙ্গামতীর চরে। সূর্যোদয় দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়া চলবে না। নৌকায় চড়ে চরে পৌঁছাতেই মনটা অন্য রকম হয়ে গেল। দিগন্তের ওপার থেকে সূর্য যখন ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল, আকাশটা লাল-কমলা-সোনালি রঙে ছেয়ে গেল। সাগরের জলে সেই আলোর প্রতিফলন দেখে মনে হচ্ছিল, পুরো সমুদ্রটাই যেন আগুনের মতো জ্বলছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু ঢেউয়ের শব্দ। সে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থমকে গেছে এখানে এসে। ছোট ছোট লাল কাঁকড়া বালুর ওপর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। তাদের দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল প্রকৃতির নিজস্ব একটা ছন্দ আছে, আমরা শুধু সেই ছন্দের নীরব দর্শক।

এরপর গেলাম রাখাইন পল্লিতে। জায়গাটা আমার সব সময়ই প্রিয়। রাখাইন মানুষদের জীবনযাত্রায় একটা সরলতা আছে—ঢাকার কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ। তাদের সংস্কৃতি, তাদের হাসি আর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে তাদের তাঁতে বোনা কাপড়। প্রতিটি সুতায় যেন একটা গল্প বোনা আছে। ফতুয়া হোক বা শাড়ি, হাতে তৈরি প্রতিটি পোশাকে একটা আলাদা আন্তরিকতা থাকে, যা যন্ত্রের তৈরি পোশাকে কখনো পাওয়া যায় না। আমরা হাতে বোনা ফতুয়া কিনলাম। গায়ে দিলেই মনে হয়, কুয়াকাটার একটা টুকরো সঙ্গে নিয়ে চলেছি।
তবে একটা বিষয় মনকে একটু ভারী করে দিল। আগের তুলনায় এ পল্লিতে রাখাইন পরিবারের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। যে সংস্কৃতি, যে ঐতিহ্য এত সুন্দর, তা যদি একদিন হারিয়ে যায়, সেটা হবে সত্যিই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আরও পড়ুন
চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু ঢেউয়ের শব্দ।

কুয়াকাটায় লেবুবনের খাবার বেশ বিখ্যাত। দুপুরে সেখানে একটা মাছের দোকানে বসে পড়লাম। অর্ডার দিলাম ছুরি মাছের ভর্তা, তারিয়াল মাছ, ডাল-ভাত আর সঙ্গে বাগান থেকে সরাসরি আনা তাজা লেবু। খাবার আসতে না আসতেই নামল ঝুম বৃষ্টি। চারপাশে বৃষ্টির শব্দ, সামনে বিশাল সমুদ্র, হাতে গরম ভাতের থালা! এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত জীবনে কমই আসে। বৃষ্টি আর সমুদ্র মিলে যেন একটা সুর বাজাচ্ছিল; আমরা দুই বন্ধু সেই সুরের মধ্যে বসে পেট পুরে খাচ্ছি।

বৃষ্টি থামলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম তিন নদীর মোহনায়। যেখানে নদী আর সমুদ্র একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। সেই মিলনস্থলের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। সেখানে সমুদ্রের পাড়ে দোলনা বসানো হয়েছে। দোলনায় বসে সামনে অসীম সমুদ্র দেখতে দেখতে দুলতে থাকা; মনে হচ্ছিল যেন শৈশবে ফিরে গেছি, সব চিন্তা উড়ে গেছে বাতাসে।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত আমার বড্ড প্রিয় জায়গা।

সন্ধ্যায় ফিরে এলাম সৈকতে। পরদিন চলে যাব, এটাই ছিল শেষ রাত। মনের ভেতর হালকা বিষণ্নতা। বিদায়ের আগের রাতে সব সময় একটা মিষ্টি কষ্ট থাকে। রাতভর সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে দুই বন্ধু কথা বললাম, গান শুনলাম, আবার কখনো চুপ করে শুধু সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কথা ছাড়াও যে বন্ধুত্ব টিকে থাকে, সেই নিস্তব্ধতাই হয়তো সবচেয়ে গভীর।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত আমার বড্ড প্রিয় জায়গা। বারবার যাই, বারবার ফিরে আসি—প্রতিবার নতুন কিছু নিয়ে, প্রতিবার একটু বেশি সমৃদ্ধ হয়ে। ভ্রমণই আমাকে শান্তি দেয়, আর কুয়াকাটা সেই শান্তির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঠিকানা। যত দিন সমুদ্র ডাকবে, আমি আসব।

শিক্ষার্থী, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়