বর্ষায় কেন অন্তত একটি আমলকীগাছ লাগাবেন

গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে দেশি আমলকী। রাঙাদ্বীপ রিসোর্ট, রাঙামাটিছবি: সুপ্রিয় চাকমা

বর্ষার প্রতিটি চারার সঙ্গে যদি একটি করে আমলকীগাছও মাটিতে স্থান পায়, সেটি হতে পারে ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় মোক্ষম বিনিয়োগ। বর্ষা এলেই দেশজুড়ে শুরু হয় বৃক্ষরোপণের উৎসব। রাস্তার ধারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা পতিত জমিতে হাজার হাজার চারা রোপণ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পায় দ্রুতবর্ধনশীল বনজ গাছ কিংবা ফলদ গাছ। কিন্তু এমন একটি দেশীয় বৃক্ষ রয়েছে, যা একই সঙ্গে ফল, পুষ্টি, পরিবেশ এবং ভেষজ সম্ভাবনার দারুণ সমন্বয়; আর তা হলো আমলকী।

গ্রামবাংলার মানুষ একসময় বলতেন, ‘বাড়িতে একটি আমলকীগাছ মানে ঘরে একটি ওষুধের বাক্স।’ বহু শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও লোকজ চিকিৎসায় আমলকী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাও এর পুষ্টিগুণ ও জৈব সক্রিয় উপাদান নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আমলকী

ছোট ফল, সম্ভাবনা বড়
আমলকীকে সাধারণত ভিটামিন সির উৎস হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাইরে এতে রয়েছে পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্যানিন, গ্যালিক অ্যাসিড ও এলাজিক অ্যাসিডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট উপাদান। এসব উপাদান শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের গবেষকদের একটি গবেষণায় দেশীয় পাঁচটি অবহেলিত ফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষিত ফলগুলোর মধ্যে আমলকীতেই ভিটামিন সির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল। এতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট উপাদানও পাওয়া গেছে।

বর্ষাই কেন সবচেয়ে উপযুক্ত সময়
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টি ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর জন্য আদর্শ। বৃষ্টির পানিতে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে, চারার শিকড় দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয় না। আমলকী ধীরে বেড়ে ওঠা গাছ হলেও একবার প্রতিষ্ঠিত হলে কয়েক দশক ধরে ফল দেয়। তুলনামূলক কম পরিচর্যাতেই এটি টিকে থাকতে পারে। তাই বর্ষাকালে রোপণ করা একটি চারা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন
আমলকী ডিটক্স ওয়াটার :ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ করে। হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে দেশীয় বৃক্ষের গুরুত্ব
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এবং মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তন, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এমন বাস্তবতায় দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষের গুরুত্ব বাড়ছে। এসব গাছ স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোজিত। আমলকী কার্বন ধারণেও সহায়তা করে, পাখি ও উপকারী প্রাণীর আবাস তৈরি করে এবং গ্রামীণ পরিবেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে।

হারিয়ে যাচ্ছে আঙিনার ভেষজ ঐতিহ্য
একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে নিম, বহেরা, হরীতকী, অর্জুন ও আমলকী ছিল পরিচিত দৃশ্য। আজ সেই জায়গা দখল করেছে কংক্রিট কিংবা বিদেশি শোভাবর্ধনকারী গাছ। এতে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় ভেষজ ঐতিহ্যও। শিশুদের অনেকেই এখন আমলকীগাছ চিনতে পারে না। অথচ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ইউনিয়ন পরিষদ, মসজিদ কিংবা কমিউনিটি ক্লিনিকের আঙিনায় পরিকল্পিতভাবে ঔষধি উদ্যান গড়ে তোলা সম্ভব।

আমলকী চা

অর্থনীতিতে সম্ভাবনা
আমলকীর বাজার শুধু কাঁচা ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আচার, মোরব্বা, ক্যান্ডি, জুস, শুকনা গুঁড়ো, ভেষজ চা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যপণ্য তৈরিতে এর ব্যবহার বাড়ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হতে পারে। গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণে আমলকীভিত্তিক ক্ষুদ্র খাদ্যশিল্পও গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি চারার দীর্ঘ ছায়া
একটি আমলকীগাছ ফল দিতে কয়েক বছর সময় নেয়। কিন্তু একবার ফলন শুরু হলে বহু বছর ধরে মানুষকে পুষ্টি দেয়। প্রতিবেশী, পাখি, পরিবেশ—সবাই এর সুফল পায়। বৃক্ষরোপণের মৌসুমে তাই শুধু কতটি চারা লাগানো হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কী ধরনের গাছ লাগানো হলো?

যদি প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি বিদ্যালয় এবং প্রতিটি গ্রাম অন্তত একটি করে আমলকীগাছ রোপণ করে, তবে কয়েক দশক পর তার সুফল মানুষের স্বাস্থ্যেও দৃশ্যমান হবে। তাই আসুন, দেশীয় ফলদ ও ভেষজ বৃক্ষ বেশি বেশি রোপণ করি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ গ্রিন ইনিশিয়েটিভ