লেখককে হতে হয় পাঠক, পর্যবেক্ষক এবং সংবেদনশীল মানুষ

প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’–এ অংশগ্রহণকারী তরুণ লেখকেরাছবি: মীর হোসেন

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ছিল সেদিন সকালে। ঢাকার কারওয়ান বাজারও তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই প্রথম আলো কার্যালয়ে একে একে জড়ো হচ্ছিলেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা তরুণ লেখকেরা। কারও হাতে নোটবুক, কারও চোখে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ। সামনে দিনভর লেখালেখি নিয়ে কথা হবে। কীভাবে একটি গল্প জন্ম নেয়? কবিতার শব্দ কীভাবে পাঠকের অনুভূতি হয়ে ওঠে? কিংবা একটি পাণ্ডুলিপি কীভাবে বইয়ের মলাটে পৌঁছায়?

গত ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ ছিল দুই মাসের লেখালেখি কর্মশালার শেষ আয়োজন। কর্মশালার শুরু হয়েছিল অনলাইনে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৩০০ জন এতে অংশ নেন। মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে ৬০ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে সেরা পাঁচজন পান বিশেষ স্বীকৃতি।

সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর একে একে খুলতে থাকে লেখালেখির নানা দরজা। দিনভর সাতটি সেশনে কবিতা, ফ্ল্যাশফিকশন, মাইক্রোফিকশন, অনুবাদ, ভ্রমণসাহিত্য, ফিচার, ফিকশন, নন-ফিকশন, প্রকাশনা ও সম্পাদনা নিয়ে কথা বলেন দেশসেরা লেখক, কবি, সাংবাদিক, অনুবাদক ও প্রকাশকেরা।

কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের আলোচনায় ব্যক্তিগত অনুভূতি কীভাবে কবিতার ভাষা পায়, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি তখনই কবিতার শক্তি অর্জন করে, যখন তা ভাষার মাধ্যমে অন্যের অনুভূতিকেও স্পর্শ করতে পারে। কবিতা শুধু কবির নিজের কথা নয়, তার ভেতর দিয়ে পাঠকও যেন নিজের কোনো অনুভূতির মুখোমুখি হন। লেখার এই ক্ষমতাই তাকে আলাদা করে। একটি কবিতা, গল্প কিংবা সিনেমা কখনো কখনো পরিচিত পৃথিবীর বাইরে অন্য একটি পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে পাঠক নতুন মানুষ, নতুন জীবন, নতুন অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হন। লেখকের কাজ তাই শুধু নিজের কথা বলা নয়, পাঠকের দেখার জগৎটিকেও একটু বড় করে দেওয়া।

অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন মনে করিয়ে দেন, অনুবাদ মানে শুধু এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় প্রতিস্থাপন করা নয়। একটি ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন ও মনোজগৎ। অনুবাদককে তাই শব্দের পাশাপাশি ধরতে হয় সেই জীবনের স্বরও। এই অর্থে প্রত্যেক মানুষই অনুবাদক। ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ভ্রমণসাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি জায়গার সৌন্দর্য দেখে ফিরে এসে তার বর্ণনা করলেই ভ্রমণসাহিত্য হয়ে ওঠে না। সেই জায়গার মানুষের জীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন বাস্তবতাকে দেখতে হয়। পর্যবেক্ষণের সেই চোখই একটি ভ্রমণকে পাঠকের নিজের অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে পারে।

তারপর আসে গল্প। তবে বড় গল্প নয়, অল্পকথায় বলা গল্প। কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল কথা বলেন ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন নিয়ে। অল্প পরিসরে গল্পের আবহ, চরিত্র ও অনুভূতি তৈরি করা সহজ নয়। সেখানে একটি শব্দও কখনো কখনো গল্পের ভার বহন করে। তাই সংক্ষিপ্ত লেখায় প্রয়োজন আরও বেশি সংযম, মনোযোগ ও নির্মাণকৌশল। তবে কৌশলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখার সঙ্গে থাকা। নিয়মিত চর্চা ছাড়া লেখার দক্ষতা তৈরি হয় না। লেখার টেবিলে ফিরে আসতে হয় বারবার। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন লেখার আহ্বান জানান।

কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের হাত থেকে সনদ নেওয়ার মুহূর্তে।

কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের আলোচনায়ও ফিরে আসে সেই চর্চার কথা, তবে অন্য একটি পথ ধরে—পাঠ ও পর্যবেক্ষণের পথ। একজন লেখকের বড় প্রস্তুতি হলো পড়া। কিন্তু শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা পড়লেই হয় না, পড়তে হয় মানুষকেও। দেখতে হয় চারপাশের জীবন। মানুষের আনন্দ, কষ্ট, দ্বিধা, সম্পর্ক, নীরবতা—সবকিছুর প্রতি তৈরি করতে হয় সংবেদনশীলতা। পৃথিবীকে অনুভব করতে না পারলে সেটা নিয়ে গভীরভাবে লেখা কঠিন। এই জায়গাতেই লেখালেখি কেবল একটি দক্ষতা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে জীবনকে দেখার একটি পদ্ধতি।

কিন্তু লেখালেখির পৃথিবী কি সত্যিই এত সুন্দর? এই প্রশ্নের উত্তর যেন আরও কঠিনভাবে সামনে নিয়ে আসেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। তিনি কথা বলেন লেখালেখির বাস্তবতা নিয়ে। লেখা থেকে উপার্জন, লেখকজীবনের অনিশ্চয়তা এবং শিল্পের পথে ব্যর্থতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। আনিসুল হক নীরদ শ্রী চৌধুরীকে উদ্ধৃতি করে বলেন, ‘লেখক দুই প্রকার—ছাগল লেখক ও পাগল লেখক।’

কথাগুলো শুনতে শুনতে অন্য একটি ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে লেখালেখির পথকে অনেক সময় সৌন্দর্য ও খ্যাতির পথ মনে হয়। এখানেও ভেতরে থাকতে পারে দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান, নিঃসঙ্গতা ও অনিশ্চয়তা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কিসহ নানা লেখকের প্রসঙ্গও আসে লেখকজীবনের সংগ্রাম নিয়ে আলোচনায়। তাঁদের জীবন দেখায়, লেখালেখির সঙ্গে প্রতিভার পাশাপাশি জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ সাধনা ও একাকিত্ব। শুধু প্রশংসা কিংবা খ্যাতির জন্য নয়, লিখতে হবে মানুষের উপকারে, সৌন্দর্য সৃষ্টিতে এবং নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাবে। মূলত এসবই লেখার উদ্দেশ্য হতে পারে।

আরও পড়ুন

এতক্ষণে লেখার জন্ম থেকে তার যাত্রাপথের অনেকটাই জানা হয়েছে। কিন্তু একটি লেখা শেষ হওয়ার পর তার গন্তব্য কোথায়?
সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ এবং বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক জাফর আহমদ রাশেদ কথা বলেন পাণ্ডুলিপি থেকে বই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ে। পাণ্ডুলিপি কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, বইয়ের সারসংক্ষেপে কী থাকতে পারে, লেখক পরিচিতি কীভাবে তৈরি করা যায় এবং একটি বই কেন প্রকাশযোগ্য—এসব বিষয় উঠে আসে আলোচনায়। ভালো লেখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই লেখাকে গোছানোভাবে উপস্থাপন করাও লেখকের দায়িত্ব। একটি পরিচ্ছন্ন ও সুসংগঠিত পাণ্ডুলিপি লেখকের পেশাদারত্বের পরিচয় বহন করে।

ফিচার ও সংবাদ লেখার কৌশল নিয়ে কথা বলেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। ‘ফাইভ ডব্লিউএইচ’ নীতি, পাঠকের মানসিকতা, শিরোনাম ও ইন্ট্রোর গুরুত্বের পাশাপাশি সঠিক তথ্যকে আকর্ষণীয় ও পাঠযোগ্য করে উপস্থাপনের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। দিন যত এগোয়, লেখালেখির একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভালো লেখা আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিভার ফল নয়। পাঠ, পর্যবেক্ষণ, অনুভব, চর্চা, ব্যর্থতা এবং আবার শুরু করার সাহস থেকেই লেখকপ্রতিভা সমৃদ্ধ করে।

‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’–এর সাতটি সেশন তাই লেখালেখির সাতটি আলাদা পাঠের মতো। কোথাও কবিতার ভাষা, কোথাও অনুবাদের দায়, কোথাও অল্প কথায় গল্প বলার কৌশল, কোথাও মানুষের জীবনকে দেখার চোখ। আবার কোথাও লেখকজীবনের কঠিন বাস্তবতা, কোথাও পাণ্ডুলিপি থেকে বই হয়ে ওঠার প্রস্তুতি।

দিন শেষে হাতে তুলে দেওয়া হয় সনদ। শেষ হয় আয়োজন। কিন্তু লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো সমাপ্তি হয়তো আসলে সমাপ্তি নয়। কারণ, একটি লেখা শেষ হওয়ার পরও থেকে যায় আরেকটি লেখা। একটি গল্পের পর আরেকটি গল্প। একটি বইয়ের পর আরেকটি বই। আর প্রতিটি লেখার সঙ্গে লেখককে নিজের কাছে, নিজের দেখা পৃথিবীর কাছে, মানুষের কাছে আবার ফিরে যেতে হয়। লেখালেখি তাই শুধু শব্দ সাজানোর কাজ নয়। এটি নিজেকে খুঁজে ফেরারও এক দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রায় লেখককে হতে হয় পাঠক, পর্যবেক্ষক ও সংবেদনশীল মানুষ। চারপাশের পৃথিবীকে গভীরভাবে অনুভব করে তাকে ভাষায় রূপ দেওয়াই হয়তো লেখকের সবচেয়ে বড় সাধনা।

২৮ আগস্টের আয়োজন শেষ হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো সেদিন উঠেছিল—একটি ভালো লেখা কীভাবে জন্ম নেয়, কেন মানুষ লেখে, লেখার দায়িত্ব কতটা, আর শব্দ কীভাবে অন্যের জীবনে আলো ফেলতে পারে, সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ এখনো বাকি...।

অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬