শব্দের বন্দরে অনুভূতির নোঙর

কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের হাত থেকে সনদ নেওয়ার মুহূর্তে।

অক্ষরের স্পর্শে কল্পনার ক্যানভাসকে রঙিন করতে এবং তরুণ মননের সুপ্ত সৃজনশীলতাকে প্রস্ফুটিত করতে সম্প্রতি প্রথম আলো কার্যালয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’। সাহিত্য ভাবনা, গল্প, অণুগল্প, কবিতা এবং সাহিত্য রচনার ব্যাকরণ ও বৈচিত্র্যময় শৈলী নিয়ে এই মেলবন্ধনে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করেন দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক ও প্রথিতযশা প্রকাশকেরা। উদীয়মান তরুণ সাহিত্যপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছিল প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার এক আনন্দময় মিলনমেলা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষের প্রতিটি চেয়ারে তখন উৎসুক চোখ, হাতে খোলা নোটবই—কেউ মন দিয়ে শুনছেন, কেউ তাড়াহুড়া করে টুকে নিচ্ছেন প্রিয় লেখকের একটি বাক্য, যেন সেটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই নীরব মনোযোগের মধ্যেই টের পাওয়া যাচ্ছিল, সনদের চেয়ে বড় কিছু একটা এই কক্ষে ঘটছে।

সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বর্ণিল এই আয়োজনের সূচনা ঘটে।
স্বাগত বক্তব্যে বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা মুহসিনা বুশরা বলেন, ‘লেখকের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে সমাজ বদলের শক্তি। এই শক্তিশালী কলমই পারে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে।’

উৎসবের প্রথম ভাগে ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন নিয়ে আলো ফেলেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। প্রজ্ঞার নানা মাত্রা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, সাহিত্যের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে একাগ্রতায়। ফ্ল্যাশফিকশন হলো একঝলক আলোর মতো আর মাইক্রোফিকশন যেন এক নিশ্বাসের মধ্যে মনের ভাবনা ও অনুভূতির তরঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া। পাশাপাশি ছোটগল্পের গাঁথুনিতে বাস্তব ও বিমূর্ত ধারণার সঠিক প্রয়োগ নিয়ে কথা বলেন তিনি। ফ্ল্যাশফিকশন গল্পের শব্দসংখ্যা হবে ৫০০ থেকে ১০০০–এর মধ্যে। মাইক্রোফিকশন হবে ১০০ শব্দের নিচে। কখনো তা ৩০০ শব্দ পর্যন্ত হতে পারে।

পরবর্তী পর্বে অনুবাদ সাহিত্য ও ভ্রমণকাহিনির নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের বিশাল আকাশের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাতে অনুবাদের কোনো বিকল্প নেই।’ অনুবাদককে মূল ভাষার পাশাপাশি সম্পর্কিত সংস্কৃতিকেও গভীরভাবে অনুধাবনের পরামর্শ দেন তিনি।

ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, অনুবাদ যদি না থাকত, বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের কাছাকাছি আসতে পারত না। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলেন। দুটি শব্দ ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’। আক্ষরিক অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়াবে ‘পাউরুটি ও মাখন’। আমরা যদি এটাকে অনুবাদ করি তাহলে কি ব্রেড অ্যান্ড বাটারের জায়গায় রুটি ও মাখন দেব? অবশ্যই নয়। কারণ, এখানে ব্রেড অ্যান্ড বাটার বলতে বোঝানো হচ্ছে মূল আয়ের পথ। তাহলে এখানে আমরা ব্রেড অ্যান্ড বাটারকে রুটি ও মাখন না লিখে লিখব রুটিরুজি। এখানে রুটি শব্দটা আছে আর আমরা যোগ করব রুজি।

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খাতায় রূপ দেওয়ার কৌশল হিসেবে এই সাহিত্যিক বলেন, নতুন কোনো জনপদে গেলে সেখানকার দৈনন্দিন জীবন, কাঁচাবাজার ও ইতিহাসকে গভীরভাবে দেখতে হবে; যা সাধারণের চোখে এড়িয়ে যায়, তা-ই ফুটিয়ে তুলতে হবে লেখায়।

গ্রন্থ প্রকাশনা ও সম্পাদনার নানা খুঁটিনাটি তুলে ধরেন বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদ এবং সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ। তরুণদের উদ্দেশে তাঁরা বলেন, ‘প্রাপ্তি বা জনপ্রিয়তার কথা না ভেবে লেখার গুণগত মানের ওপর নজর দেওয়াই আসল কাজ। তবে সুন্দর ভাবনাগুলোকে হারিয়ে যেতে না দিয়ে বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করাও জরুরি।’

সাংবাদিকতা ও বিশেষ ফিচারের আলেখ্য নিয়ে কথকতা পরিচালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একধরনের তাড়না। একটি আদর্শ ফিচার হতে হবে মেদহীন এবং তথ্যের সঙ্গে রসাত্মক বিনোদনের চমৎকার মেলবন্ধন। ভাষার সৌন্দর্য তখনই অর্থবহ, যখন তা গল্পকে এগিয়ে নেয়; গল্পকে আড়াল করে না।

লেখার কৌশলে ‘ফাইভ ডব্লিউএইচ’ নীতি, পাঠকের মানসিকতা বোঝা ও আকর্ষণীয় শিরোনামের গুরুত্ব ব্যক্ত করেন সুমনা শারমীন। একটি ভালো ফিচার শেষ হওয়ার পরও যদি তার গল্প পাঠকের মনে থেকে যায়, তাহলে সেই লেখা সফল। কখনো কোনো প্রশ্ন রেখে শেষ করা যায়, কখনো কোনো দৃশ্য দিয়ে, আবার কখনো এমন একটি তথ্য দিয়ে, যা পাঠককে লেখাটি শেষ করার পরও ভাবতে বাধ্য করে।

কাল্পনিক ও অকাল্পনিক লেখার পার্থক্য ফুটিয়ে তুলে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন বলেন, একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর আত্মপর্যবেক্ষণ। কাল্পনিক লেখা বা ফিকশনের প্রাণ হলো প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা।

শিল্প ও সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সত্য নিয়ে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক কবি সাজ্জাদ শরিফ বলেন, শিল্পের মূল কাজ জীবনের সত্য ও অনুভূতির গভীরতাকে ছুঁয়ে দেখা। জীবনের রূপগুলোকে নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধাবন করাই সাহিত্যের সৌন্দর্য। তিনি আরও বলেন, কবিতা কথা বলে সুর দিয়ে, ছবি দিয়ে। কবিতা হলো উপলব্ধির বিষয়।

শেষলগ্নে লেখকজীবনের সংগ্রাম ও পথচলা নিয়ে প্রেরণা জোগান প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘শিল্পীর পথচলায় ব্যর্থতাই মূল শিক্ষা; ভুল থেকেই জন্ম নেয় সত্যিকারের শিল্পী।’ তরুণদের পাঠাভ্যাস বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘পৃথিবীকে সুন্দর রাখতে গল্প-কবিতা লিখে যেতে হবে। হৃদয়ে কবিতাকে ধারণ করতে হবে, অন্তত ১০০টি কবিতা মুখস্থ রাখলে সাহিত্যচর্চার পথ অনেক সুগম হয়।’

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য স্মরণ করে আনিসুল হক বলেন, ‘লেখার উদ্দেশ্য কখনোই কেবল অর্থ উপার্জন হওয়া উচিত নয়। মানুষের কল্যাণ, সৌন্দর্যবোধের বিকাশ এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করাই হওয়া উচিত একজন লেখকের প্রধান লক্ষ্য।’ এই পথ সহজ নয়, তবু নিষ্ঠার সঙ্গে লিখে যেতে হবে।

আরও পড়ুন

প্রতিটি সেশন শেষে হয় খোলামেলা প্রশ্নোত্তর পর্ব। আলোচকদের সামনে ভিড় জমে যায় হাত তোলা তরুণদের। কেউ জানতে চান লেখার জন্য উপযুক্ত সময় বলে কিছু আছে কি না, কেউ প্রশ্ন করেন প্রত্যাখ্যানের ভয় কীভাবে জয় করা যায়। লেখকেরা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন, কখনো রসিকতায়, কখনো নিজেদের সংগ্রামের গল্পে। প্রশ্ন আর উত্তরের এই আদান-প্রদানে দিনভরের পাঠ যেন হঠাৎই ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। প্রত্যেক তরুণ মুখে তখন একটাই জিজ্ঞাসা, নিজের গল্পটাও কি একদিন এভাবে বলা যাবে?

এ ছাড়া তরুণদের লেখালেখি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন শাকিব হাসান ও তাহসিন আহমেদ।
সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের প্রতিনিধিও ভবিষ্যতে এসব তরুণ লেখকদের প্রাঞ্জল লেখা পাঠের আশাবাদ প্রকাশ করেন। পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন উৎসবের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী।

অনুষ্ঠান শেষে হাতে সনদ এবং মনে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরে তরুণ সাহিত্যিকের দল। তবে এটি কেবল কাগজের সনদ ছিল না; বরং ছিল ভবিষ্যতের সাহিত্যাকাশে ডানা মেলার বিপুল অনুপ্রেরণা ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা।
বৃষ্টি থেমে যাবে একদিন,
সনদও ফিকে হবে কাগজের ভাঁজে, কিন্তু আজ যে ডানাগুলো মেলল,
তারা উড়ে বেড়াবে বাংলা সাহিত্যের আকাশজুড়ে। প্রতিটি সেশন শেষে হয় খোলামেলা প্রশ্নোত্তর পর্ব। আলোচকদের সামনে ভিড় জমে যায় হাত তোলা তরুণদের। কেউ জানতে চান লেখার জন্য উপযুক্ত সময় বলে কিছু আছে কি না, কেউ প্রশ্ন করেন প্রত্যাখ্যানের ভয় কীভাবে জয় করা যায়। লেখকেরা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন, কখনো রসিকতায়, কখনো নিজেদের সংগ্রামের গল্পে। প্রশ্ন আর উত্তরের এই আদান-প্রদানে দিনভরের পাঠ যেন হঠাৎই ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। প্রত্যেক তরুণ মুখে তখন একটাই জিজ্ঞাসা, নিজের গল্পটাও কি একদিন এভাবে বলা যাবে?

এ ছাড়া তরুণদের লেখালেখি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন শাকিব হাসান ও তাহসিন আহমেদ।
সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের প্রতিনিধিও ভবিষ্যতে এসব তরুণ লেখকদের প্রাঞ্জল লেখা পাঠের আশাবাদ প্রকাশ করেন। পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন উৎসবের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী।

অনুষ্ঠান শেষে হাতে সনদ এবং মনে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরে তরুণ সাহিত্যিকের দল। তবে এটি কেবল কাগজের সনদ ছিল না; বরং ছিল ভবিষ্যতের সাহিত্যাকাশে ডানা মেলার বিপুল অনুপ্রেরণা ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা।
বৃষ্টি থেমে যাবে একদিন,
সনদও ফিকে হবে কাগজের ভাঁজে, কিন্তু আজ যে ডানাগুলো মেলল,
তারা উড়ে বেড়াবে বাংলা সাহিত্যের আকাশজুড়ে।

অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬