পানির মধ্যে বেঁচে থাকি, ভেসে থাকি জীবন্মৃত
১৯৯০ সালে চট্টগ্রামে প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়। কৈশোরে আমার দেখা প্রথম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল সেটা। বড় মাসির বাড়ি চট্টগ্রামের কাশশিস গ্রামে। মাসির কাছে চিঠি লিখেছি, বার্ষিক পরীক্ষার পরে তাঁদের বাড়ি যাব। তিনি সেই চিঠি পেয়েছেন। ওনার ছেলে উজ্জ্বল দাদা এসে আমাকে শহরের বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কর্ণফুলী নদীর ওপরে বড় একটি দীর্ঘ নতুন সেতু নির্মিত হয়েছে। নবনির্মিত এই সেতুর কথা কাগজে পড়েছি, টিভিতে দেখেছি। উজ্জ্বল দাদা আমাকে সাইকেলের সামনে রডে বসিয়ে সেই সেতুর ওপর দিয়ে নিজেদের গ্রামে নিয়ে যান। অবাক চোখে বিপুল বিস্ময়ে দেখেছি, নিচে প্রবহমান কর্ণফুলী আর ওপরে সুন্দর এই দীর্ঘ সেতু।
নব্বইয়ের সেই দাপুটে ঘূর্ণিঝড়ে সেতুটি ভেঙে পড়ে গেল। আমাদের পাথরঘাটা জেলেপাড়ার দোতলার বাসায় সেদিন রাতে অসংখ্য নারী ও শিশু আশ্রয় নিয়েছিল। ঘরের ভেতরে নারীদের আশ্রয়ের জায়গা করে দিতে আমরা ছেলেরা সবাই সারা রাত বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে বসে ছিলাম। প্রবল দমকা হাওয়া বাসার জানালার কাচ পর্যন্ত ভেঙে দিয়েছিল। হাওয়ার তোড়ে মনে হচ্ছিল গোটা বিল্ডিংটা দেশলাই বাক্সের মতো এক্ষুনি উড়ে যাবে। আর বিল্ডিংয়ের নিচে কর্ণফুলী থেকে উঠে আসে প্রচুর পানি। বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে নিচে যেদিকে তাকাই, শুধু পানি আর পানি। জেলেপাড়ার প্রতিটি ঘরে পানি ঢুকে গিয়েছিল। শহরের বুকে সেই প্রথম আমার বন্যা দেখা।
লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। জীবন তবু বলে, তোমাকে এখনো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে হবে।
পরদিন থেকে মুখে মুখে অনবরত খবর ভেসে আসছিল চারদিকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির। কর্ণফুলীর পানিতে মাছের মতো মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে। আমার বাবা বন্ধুদের নিয়ে বেশ কয়েক দফায় সমুদ্র উপকূলবর্তী নানা জায়গায় গিয়ে প্রচুর লাশ দাফন করে এসেছেন। ঝড়ে বিধ্বস্ত পরিবারগুলোতে ত্রাণ বণ্টন করেছেন। বাবার মুখে ঝড়ের তাণ্ডবের কত অসহায় চিত্রের কথা তখন শুনেছি।
বাবা দেশ ছেড়ে চলে আসার পর কিছুদিন রাউজান উত্তর গুজরাতে আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেবার বেশ বড় বন্যার মুখোমুখি হলাম। বাড়ির বড় উঠানেও নৌকা চলে আসে। প্রায় দুই মাস নৌকা ছিল একমাত্র বাহন। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় পানি ফুটিয়ে খেতে হয়েছে। পানির মধ্যে হেঁটে উত্তর গুজরা স্কুলে যেতে গিয়ে একবার পায়ে কাঁটা ঢুকল। সেই কাঁটা পচে জায়গাটাতে তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি হয়। মামার মেজ ছেলে সুজয়দার শ্যালক বিভু বোস তখন সদ্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেছেন। তিনি আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে গিয়ে অধ্যাপক ডাক্তার এবং সহকর্মী ডাক্তারদের সঙ্গে মিলে পায়ের তলায় ক্ষত জায়গাটা কম্পাস বসিয়ে গোল করে কেটে জীবাণুমুক্ত করেন। এরপর জীবনের ঘনঘটার স্রোতে বানভাসীর মতো আমাদেরও উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছেড়ে আসতে হলো।
পশ্চিমবঙ্গে দেড় শ টাকা ভাড়ায় একজনের বাড়ির পরিত্যক্ত গুদামঘরে একা থেকে পড়াশোনা করেছি। মা–বাবা ও ভাইবোন তখন থাকতেন আসামে। সেই ভাড়া ঘরের জায়গাটাতেও বর্ষাকালে প্রচুর পানি জমত। পানির মধ্যে অনেকে মশারি টেনে মাছ ধরত। এমনিতে ভালো খাবারদাবার খুব একটা জুটত না। ফ্যানে-ভাতে আলু দিয়ে মেখে খেয়ে নিতাম বেশির ভাগ দিন। অনাহারে–অর্ধাহারেও কেটেছে বহু সময়। তবে বর্ষায় অন্যের ধরে আনা মাছ আমার ঘরে রান্না হতো। আমার পাতেও দু-এক বেলা মাছ জুটত।
মায়ের গয়না বিক্রি করা ত্রিশ হাজার টাকায় আনন্দনগর অঞ্চলে দুই কাঠা জমি কিনে রেখেছিলাম তখন। ভালো জায়গায় জমি কিনতে গেলে চার-পাঁচ লাখ টাকা প্রয়োজন। যা আমাদের কাছে দুঃসাধ্য শুধু নয়, কল্পনার বাইরে। আমি নিজেও মাত্র বিশ-ত্রিশ টাকা বেতনে ছাত্র পড়িয়ে নিজের ঘরভাড়া, খাওয়া খরচ, পড়াশোনার খরচ চালাতাম। মায়ের এই সামান্য টাকাটাও বাবা ব্যবসার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, যেভাবে মায়ের তিলে তিলে প্রতিটি সঞ্চয় বাবা ব্যবসার কাজে লাগিয়েছেন। বিনিময়ে সেই টাকা আর কখনো ফেরত আসেনি। সেবার মা তাই টাকাটা বাবাকে না দিয়ে আমার মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে দুই কাঠা জমি কিনে রেখেছেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নিয়মিত চিঠি লিখতাম। মায়ের বিক্রি করা টাকায় জমি কেনার কথাটা অন্যভাবে একবার লিখেছিলাম। সুনীল দাদা আমার সেই ব্যক্তিগত চিঠি কৃত্তিবাস পত্রিকায় ছেপে দেন।
একসময় আসাম থেকে পরিবারের সবাই আমার চিলতে ভাড়া ঘরে এসে উঠল। অন্য জায়গায় ভাড়া নিলাম। সেখান থেকে আবার অন্য বাড়িতে। পড়াশোনা ছেড়ে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সংবাদপত্রে এগারো শ টাকা বেতনের চাকরি নিই। বাবা হাওড়া স্টেশনে ষাট টাকা দিন মজুরিতে ব্যাগ বিক্রির কাজ শুরু করেন। যেদিন রেল পুলিশ বসতে দেয় না, সেদিন সেই আয়টুকুও হতো না। আমার মা বাংলাদেশের বিএ পাস, বাবা এমএ। দূর দেশে উদ্বাস্তু হয়ে বেঁচে থাকতে গেলে সব ধরনের কাজ করতে হবে। কিন্তু ভাড়া বাড়িতে থেকে এই সামান্য আয়ে সংসার আর চলে না। মা তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক সেই কেনা জমিতে ছোট্ট একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেবেন।
দুই কাঠা জায়গার কিছুটা অংশ থেকে মাটি কেটে অন্য অংশে উঁচু করা হলো। সেই মাটির ভিতের ওপর একটা টালির ছাউনি দেওয়া বেড়ার ঘর করে আমরা নিজেদের বাড়িতে চলে এলাম। বড় রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত আসার জন্য দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো। বাড়ির ভেতরেও ঘর থেকে কুয়ো পর্যন্ত যেতে বাঁশের সাঁকো। চট্টগ্রাম শহরে শৈশব–কৈশোর জীবনে কখনো কল্পনা করিনি এমন অবস্থায় আমাদের এসে পড়তে হবে।
তবে নিজের জমিতে মা পুঁইশাক, পাটশাক, লাউ, কুমড়া, শিমসহ নানা গাছ লাগিয়ে সবজি কেনার খরচ কমিয়ে দেন। মাঝেমধ্যে তিনি পানিকচু তুলে আনতেন। সেই কচুর আগা থেকে গোড়া সবকিছুই খেতাম। আলু কিনতে না পারার অক্ষমতা এই কচু খেয়ে আমরা মিটিয়েছি। আর বর্ষা আসতেই চারদিক পানিতে ডুবে গেল। এখনো বছরে আট-নয় মাস আমাদের পাড়াতে পানি থাকে। পানিতে ডুবে সব গাছ মরে যায়।
তখন শীতকালেও ঘরের ভেতরে হাঁটুর ওপরে পানি। বেড়া আর টালির ফুটো দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আর কুয়াশা ঢুকে ঘরের ভেতরেও এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যায় না। নিচে পা রাখতেই কনকনে ঠান্ডা পানিতে শরীর কেঁপে উঠত। লেপ-তোশক কেনার ক্ষমতা নেই, কাঁথা সেলাই করার মতো অঢেল পুরোনো কাপড় নেই। মা চালের চটের বস্তার ওপরে একটা শাড়ি জড়িয়ে সেলাই করে রাখতেন। তা গায়ে দিয়ে আমরা শীতের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম। ঘরে ইলেকট্রিক লাইনও ছিল না বহু বছর। রাতে ল্যাম্প, কুপিবাতি জ্বালিয়ে পানিতে ডোবা ঘরে চৌকির ওপরে উনুন জ্বালিয়ে মা রান্না করতেন। রান্না–খাওয়া শেষে সেই গুল কয়লার উনুন নিভিয়ে অন্য জায়গায় রেখে সেই চৌকিতে গুটিসুটি মেরে বাবা-মা, ভাইবোন আমরা পাঁচজন শুয়ে থাকতাম। বর্ষাকালে ঘরের ভেতরেও টালির ফুটো দিয়ে পানি পড়ত। একেক সময় রাতে কান্না পেত। বড় প্লাস্টিক গায়ে দিয়ে পানি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম।
রাস্তায় তখন কোমরের ওপরে পানি। আমরা গামছা পরে দীর্ঘ পানিপথ ডিঙিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠতাম। গামছা নিংড়ে ব্যাগে নিয়ে শুকনা কাপড় পরে কাজে যেতাম। রাতে একই উপায়ে বাড়ি ফিরতাম। ঘরের ভেতরেও দিনে–রাতে সাপ, ব্যাঙ, মাছ ভেসে বেড়াত। বাড়িতে এখনো কার্বলিক অ্যাসিড এনে রাখি সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য।
ক্রমে মাটি আর রাবিশ ফেলে ফেলে ঘর উঁচু করলাম। বেড়ার ঘর পাকা করলাম। ওপরে ছাদ জমানোর মতো টাকা নেই, তাই টালি রেখে দিলাম। নিজেদের রাস্তা উঁচু হলো। ইলেকট্রিক পোস্ট এল, ঘরে বিদ্যুতের লাইন নিলাম। আর ফাঁকা মাঠে জনবসতি অনবরত বাড়তে লাগল। আমাদের মতো গরিব মানুষেরা সবাই জায়গা কিনে কিনে এখানে বাড়ি করেছে। কেউ বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু, কেউ বিহার, উত্তর প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিক, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও গরিব মানুষ এসে কম দামে জায়গা কিনে বাড়ি করেছে। পাড়ার নামটাও তাই নবজীবন পাড়া।
গোটা বালি বেলুড় অঞ্চলের উঁচু জায়গার পানি আমাদের এই নিচু পাড়ায় নেমে এসে মাঠ–বিল ভরিয়ে তুলত। এখন এখানেও সব বাড়ি হয়ে যাওয়ায় এবং পানি বেরোনোর কোনো পথ না থাকায় উঁচু অঞ্চলের পানি এসে ৯ মাস আমাদের ডুবিয়ে রাখে। মাটি, রাবিশ ফেলে অনেকটা উঁচু করার পরও রাস্তা, ঘর সবই এখনো পানিতে ডোবা। সরকার প্রশাসনের তেমন কোনো উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা এই প্রান্তিক মানুষের জন্য নেই। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকারও আমাদের এই পানিতে ডোবা অঞ্চলের জন্য কিছু করেনি, বর্তমান তৃণমূল সরকারের পরিকল্পনাও বছরের পর বছর বাস্তবায়িত হয় না। পানির মধ্যে আমরা তাই বেঁচে থাকি, ভেসে থাকি জীবন্মৃত।
পানিতে ডুবে এখানে বাচ্চা মারা যায়। পানিতে দাঁড়িয়ে কাপড় ইস্ত্রি করতে গিয়ে তড়িতাহত হয়ে মানুষ মারা যায়। মধ্যরাতে জীবাণু আক্রান্ত হয়ে আমাদের ঘরের বাবা-মা, ভাইবোন, আমি কোমরপানি ডিঙিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠি। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে কলেরা হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হই। কেমন সব ভয়ংকর দিন কেটেছে আমাদের। মাঝেমধ্যে পরিবারের কাউকে না কাউকে সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে হতো। মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে ওঠার পর হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতাম না। পানির মধ্যে কোনো ছোট গাড়ি আসা দূরে থাক, রিকশাও আসত না। এভাবে ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পেয়ে মা অকালে মারা গেলেন। বাবাও এখন গুরুতর অসুস্থ। হঠাৎ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে খুবই সমস্যায় পড়ে যাই। ভাই বিয়ে করে অন্য জায়গায় গিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছে। স্ত্রী আর দুটি বাচ্চাকে নিয়ে সেখানে থাকে। অসুস্থ বাবা আর প্রতিবন্ধী বোনকে নিয়ে আমি এখনো নবজীবন পাড়ায়, জীবনের সঙ্গে ধুঁকতে ধুঁকতে কবিতা লিখে যাই ...।
‘নিচে জল, উপরে পায়রা
এই নিয়ে আমাদের নবজীবন পাড়া
এক উদ্বাস্তু কবির ঘর
টালি দিয়ে জল পড়ে, খুঁটি নড়বড়
এই ঘরে আছে তবু কত সৃষ্টির স্মৃতি
অতলে তলিয়ে যাওয়া বিস্মৃতি
জীবনযুদ্ধের ইতিহাস
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষের কথা, কেই-বা জানে?
মনে রাখে?
কোথায় হয় তা প্রকাশ?’
লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। জীবন তবু বলে, তোমাকে এখনো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে হবে। হারানো দেশের মাটির মতো এই নবজীবন পাড়ার মায়াও কাটিয়ে উঠতে পারি না।
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত