দর্শক কেন আপনাকে শুনবে? ভালো উপস্থাপক হওয়ার পাঠ

প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়েছে উপস্থাপনাবিষয়ক বিশেষ কর্মশালা। ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শিরোনামে কর্মশালার চতুর্থ সেশন অনুষ্ঠিত হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। এতে ‘সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন ক্রীড়া উপস্থাপক ফাহিম রহমান, যমুনা টিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক মৌসুমী আহমেদ লোপা এবং উপস্থাপক ও অভিনয়শিল্পী মৌসুমী মৌ। এই লেখা তাঁদের বক্তব্যের প্রতিলিপি। সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক।

মৌসুমী আহমেদ লোপা, ফাহিম রহমান ও মৌসুমী মৌ।

ফাহিম রহমান, ক্রীড়া উপস্থাপক

প্রেজেন্টেশনে আমরা একটা কনটেন্টকে উপস্থাপন করি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—ধরেন, আপনি কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গেলেন, খাবার অর্ডার করলেন। এখন যে ওয়েটার বা ওয়েট্রেস খাবারটা আপনাকে সার্ভ করছেন, মূলত আমাদের উপস্থাপকের কাজটাও অনেকটা তেমন।

রান্নাঘরে যে খাবারটা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটা কত সুন্দরভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে—একজন উপস্থাপকেরও একই দায়িত্ব। কারণ, খাবারটা যিনি গ্রহণ করবেন, তাঁর প্রথম ইমপ্রেশনটা তৈরি হচ্ছে খাবার সার্ভ করার সময়। এরপর তিনি খাবারটা টেস্ট করবেন। সেখানে তৃপ্তি বা অতৃপ্তি—দুটিই কাজ করতে পারে।

আমরা আসলে নিউজটাকে ক্যারি করি। নিউজটা আমাদের কাছে আসে। রান্নাঘরে যেভাবে খাবার রান্না করা হয়, একইভাবে নিউজও প্রস্তুত হয়। প্রস্তুত হওয়ার পর নিউজটা উপস্থাপকের কাছে আসে। এরপর উপস্থাপক নিউজকে দর্শকের সামনে পরিবেশন করেন। সহজ-সরলভাবে বিষয়টা অনেকটা এ রকম।

ফাস্ট ইমপ্রেশন তৈরি করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক যাতে ভালো অনুভব করেন, তাঁর মধ্যে যাতে আগ্রহ তৈরি হয়—সেই আগ্রহ তৈরি করাটা মূলত একজন উপস্থাপকের কাজ।

আরেকটা বিষয় হলো আপনি যে নিউজটা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করছেন, সেই নিউজ সম্পর্কে আপনি নিজে অবগত কি না। ধরেন, এখন আমাকে যদি বলা হয় ফরাসি ভাষায় একটা নিউজ প্রেজেন্ট করতে বা আরবি ভাষায় একটা নিউজ প্রেজেন্ট করতে—সেটা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ওই ভাষার ওপর আমার কোনো দক্ষতা নেই। সেখানে কী বলা আছে বা নিউজটা কী নিয়ে, সে সম্পর্কেও আমার কোনো ধারণা নেই।

আমাকে আসলে সেই নিউজটাই পরিবেশন করতে হবে, যে নিউজ সম্পর্কে আমি জানি, আমার বোঝাপড়া আছে এবং জেনে-বুঝে সেটা দর্শকের সামনে পরিবেশন করছি। অন্যথায় দর্শক নিউজটাকে কখনোই বিশ্বাস করবে না।

ধরেন, আপনি একটা বিজনেস প্রেজেন্টেশন করছেন। এখন আপনি সেই বিজনেস সম্পর্কেই জানেন না। তাহলে সেই প্রেজেন্টেশন কোনো দিনই আসলে গ্রহণযোগ্য হবে না।

এই বোঝাপড়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রস্তুতিটাও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি নিউজ জানেন কি না, বোঝেন কি না, প্রতিনিয়ত নিউজের সঙ্গে থাকেন কি না, নিউজ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন কি না, আপ টু ডেট থাকেন কি না—এই বিষয়গুলো খুবই জরুরি।

অনেক সময় উপস্থাপন করতে গেলে কথায় জড়তা চলে আসে, চাহনিতে সমস্যা তৈরি হয়, ভয়েস ডেলিভারিতে সমস্যা হয়, অতিথির দিকে তাকিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি হয়। এগুলো দূর করার উপায় কী?

এটা আসলে চর্চার ব্যাপার। আমার স্পষ্ট মনে আছে, যখন প্রথমবার সাকিব আল হাসানের ইন্টারভিউ করি, শুরুতে চিন্তা করছিলাম, আমি আসলে কী প্রশ্ন করব। একই বিষয় মাশরাফি বিন মুর্তজার ক্ষেত্রেও হতে পারে। এমনটা হবেই।

কিন্তু আপনি যখন প্রস্তুতি নেবেন যে এগুলো আমার প্রশ্ন, আমি এই প্রশ্নগুলো একটা একটা করে করতে থাকব—এবং আপনি নিজেই যখন ওই কনভার্সেশনের ভেতর ইনভলভ হবেন, তখনই ইন্টারভিউটা ধীরে ধীরে ইন্টারেস্টিং হওয়া শুরু করবে।

এখানে দুইটা ব্যাপার। একটা হচ্ছে, আপনি যে প্রশ্নটা করছেন, সেটার ডেলিভারি আসলে কেমন। প্রশ্নের ভেতর উপস্থাপকের ইনভলভমেন্ট তৈরি হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন আমি যদি বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালকে প্রশ্ন করি, ‘তামিম, এবার বিপিএল হচ্ছে না, ক্রিকেটপ্রেমীরা তো আসলে হতাশ।’
এখানে বিপিএল হচ্ছে না, ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হবে—এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ, তারা মাঠে গিয়ে ক্রিকেট দেখতে পারছে না।
এখন বিষয়টা খুব সহজ ও সোজা করে প্রশ্ন করা যায়, ‘তামিম, এ বছর বিপিএল কেন হচ্ছে না?’
আবার আরেকভাবে প্রশ্ন করা যায়, ‘তামিম, ক্রিকেটপ্রেমীরা তো হতাশ হয়ে যাচ্ছে, মাঠে ক্রিকেট নেই, এ বছর কেন বিপিএল হচ্ছে না?’

প্রশ্ন কিন্তু একই। তবে ডেলিভারি দুটো আলাদা। দ্বিতীয়টা দর্শকদের পারস্পেকটিভ থেকে করা। আর প্রথম প্রশ্নটায় কোনো পারস্পেকটিভ নেই।
দর্শকদের ইনভলভ করার বিষয়টা আমার কাছে মনে হয় সঠিক এপ্রোচ। দর্শককে কীভাবে ইনভলভ করা যায়, সেই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বিষয়টা রাতারাতি হবে না। চর্চা করতে করতেই হয়।

এই চর্চাটা কীভাবে করতে পারি?  
বর্তমানে প্রশিক্ষণের প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম তাদের মতো করে প্রশিক্ষণ দিয়ে নেয়। যখন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে প্রশিক্ষণ করানো হয়।

আরেকটা দিক হচ্ছে নিজের মতো করে চর্চা করা। যেমন আয়নার সামনে চর্চা। এটা যুগ যুগ ধরে উপস্থাপকেরা করে আসছেন। এখনো অনেকে করেন। আপনি আপনার প্রথম উপস্থাপনাটা আসলে করবেন আয়নার সামনে, যেখানে আপনিই হোস্ট, আপনিই দর্শক।
আমি যখন ট্রেনিং করেছি, তখন আমাকেও বলা হয়েছিল, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কোনো একটা নিউজ নিজের মতো করে পড়ে চর্চা করো। এভাবেই শুরুটা হয়।

হঠাৎ যদি হাঁচি-কাশি চলে আসে বা গলা শুকিয়ে যায়, সেটা কীভাবে সামাল দেবেন?
এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। একটা শোর মধ্যে বা নিউজ পড়ার সময় যদি আমার কাশি আসে, এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিতে হবে। তবে এই এক মুহূর্তের ভঙ্গিমা যাতে দর্শককে ডিস্টার্ব না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খুব জোরে না কেশে যতটা সম্ভব আস্তে কাশতে হবে, অর্থাৎ বিষয়টাকে যতটা মিনিমাইজ করা সম্ভব।

একইভাবে গলা শুকিয়ে গেলে টক শো করার সময় আমাদের সামনে চা, কফি, পানি থাকে। শো চলাকালীন সেগুলো খাওয়া যেতেই পারে। তবে এমনভাবে খেতে হবে, যাতে দর্শক ডিস্টার্ব ফিল না করেন। এই বিষয়গুলোতে সচেতন হতে হবে।

মৌসুমী আহমেদ লোপা, জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক

স্ক্রিপ্ট ভুল থাকলে একজন প্রেজেন্টার বা সংবাদ উপস্থাপক কীভাবে সেটি সামাল দেবেন? সে ক্ষেত্রে তাঁকে কিছু জানতে হয় কি না?

দেখা যায়, স্ক্রিপ্ট পড়তে গেলে আমাদের টাইপিং মিসটেক অনেক বেশি হয়। ভুল তো মাঝেমধ্যে থাকেই, টাইপিং মিসটেকও থাকে। সে ক্ষেত্রে সবার আগে আপনার ভেতরে যদি নিউজটি নিয়ে সামান্যতম সেন্স থাকে, সাম্প্রতিক সময়ে যা ঘটছে, সেই সম্পর্কে যদি আপনার ন্যূনতম ধারণা থাকে, তাহলে দেখবেন টাইপিং মিসটেক থাকলেও আপনি হয়তো প্রথমে একটু ফাম্বল করবেন। এটা হতেই পারে। এতে আপনার ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই।
আপনি সেটা কতটা স্মার্টলি সামলে নেবেন, এটাই আপনার একটা দক্ষতা।

ভুল থাকলে আপনার যদি জানা থাকে, প্রথম ফ্লোতে দেখা গেল যে আপনি ওই শব্দটা একটু ভুলই পড়ে ফেললেন—যা লেখা আছে, ভুল সেটা পড়ে ফেললেন। এখন আপনি যে ভুল পড়লেন, আপনার চেহারায় সেটা প্রকাশ পাবে? তাহলে তো দর্শক ধরে ফেলবে।
তাহলে আপনাকে কী করতে হবে? ভুল করেছেন, আপনি তো রোবট না; আমরা মানুষ। কথা বলতে গেলে আমাদের ভুল হবে, এটাই স্বাভাবিক।

সংবাদ পড়ার সময় যদি আপনি ভুল পড়েও ফেলেন, ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। চাইলে দুঃখিত বলতে পারেন, অথবা ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে শব্দটা আবার পড়ে পরের লাইনে চলে যাবেন। এটাকে দর্শক কোনোভাবেই খারাপভাবে নেবেন না।
এই যে জানার ব্যাপারটা, এটা আপনার মধ্যে থাকলে দর্শক কিন্তু বুঝতে পারবেন আপনি জিনিসটা সম্পর্কে জানেন।

আপনি যে তথ্যটা দিচ্ছেন, একদম আপনার বন্ধুকে যেভাবে দেবেন, ঠিক সেভাবেই দেবেন। আপনি যে রিডিং পড়ছেন, আপনার সামনে যে টেলিপ্রম্পটার থাকছে, সেটা দেখে যে আপনি পড়ছেন—এটা দর্শককে বুঝতে দেবেন না।

একদম আপনি আপনার ড্রয়িংরুমে যেভাবে কথা বলেন, বাসায় কোনো অতিথি এলে তাঁদের সঙ্গে যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন, সেভাবেই দর্শকদের সঙ্গেও কথা বলবেন, তথ্যটা উপস্থাপন করবেন। আপনি রিডিং পড়বেন না। এভাবে করলে আপনি দর্শকদের সঙ্গে খুব দ্রুত কানেক্ট করতে পারবেন।

সংবাদ পড়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো পূর্বশর্ত থাকে। তার মধ্যে শুদ্ধ উচ্চারণ অবশ্যই জানতে হবে। শুদ্ধভাবে বলতে হবে, স্পষ্টভাবে বলতে হবে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শব্দ দর্শকদের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। দর্শককে যাতে আলাদাভাবে কোনো মনোযোগ দিতে না হয়।

আমাদের এখন স্যাটেলাইট চ্যানেল অনেকগুলো। আইপি টিভি আছে। শত শত প্রেজেন্টার। দর্শক আপনাকে কেন শুনবেন, কেন দেখবেন, আপনার চ্যানেল কেন দেখবেন?

আপনার চ্যানেলের পেছনে একটা টিমওয়ার্ক আছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এত মানুষের কাজ—সেই কাজগুলো তো আসলে আপনার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেই গুরুদায়িত্বটা কিন্তু শেষমেশ আপনি পালন করছেন।
একজন রিপোর্টার মাঠে রোদ-বৃষ্টি, ঝড়ের মধ্যে যে তথ্যটা সংগ্রহ করে নিয়ে আসছেন, সেটা আপনার হাতে তুলে দিচ্ছেন। আপনার এই তথ্য পড়াটা যত সুন্দর হবে, দর্শকদের তত বেশি আগ্রহ তৈরি হবে।
আর আপনি যদি গরগর করে পড়ে যান, রিডিং পড়ার মতো করে, তাহলে কিন্তু দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। তাঁর হাতে একটা রিমোট আছে, তিনি চ্যানেল সুইচ করে ফেলবেন।

হিজাব পরলে কি প্রেজেন্টার হওয়া যাবে না?
এটা আসলে ডিপেন্ড করে প্রতিষ্ঠানের পলিসির ওপর। এখন কিন্তু ইন্ডিপেনডেন্টে পরছে, নিউজ টোয়েন্টিফোরে পরছে; এ রকম বেশ কিছু চ্যানেল কিন্তু এই বিষয়টা চালু করেছে।

একটা সময় অবশ্য সম্ভব ছিল না। প্রতিষ্ঠান যদি অ্যালাউ করে, সে ক্ষেত্রে হিজাব পরে নিউজ পড়তে কোনো সমস্যা নেই। মোটকথা, দক্ষতা অর্জন করতে পারলে হিজাব কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

মৌসুমী মৌ, উপস্থাপক ও অভিনয়শিল্পী

উপস্থাপনা শেখাটা আসলে একটা প্রক্রিয়া। এখানে দীর্ঘ সময় দিতে হয়। এখনকার সময়ে আমার কাছে মনে হয়, অনেকের মধ্যে ধৈর্য কম। ধৈর্য কম থাকলে কোনো কিছু শেখা মুশকিল।

যে কাজটাকে আমরা পছন্দ করি বা যে কাজটা আমরা করতে চাই, ওই কাজটার প্রতি ডেডিকেটেডলি লেগে থাকতে হবে।
আপনাকে জানতে হবে বাংলাদেশে কী হচ্ছে, বিশ্বে কী হচ্ছে, আপনি অন্য নিউজগুলো দেখছেন কি না।

আমার কাজ যেহেতু মিডিয়া নিয়ে, মিডিয়াতে প্রচুর সেলিব্রিটি রয়েছেন। আমি টক শো করি, আমাকে রিয়েলিটি শো করতে হয়। আমাকে সব সময় আপডেটেড থাকতে হয়—কী হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে এবং তাঁরা কীভাবে ভাবছেন।
যেমন গতকাল যখন আমি ইন্টারভিউ নিতে গেলাম, তখনো যেতে যেতে অতিথির আরও একটি ইন্টারভিউ শুনলাম। বছর দুয়েক আগে একই অতিথির একটা ইন্টারভিউ করেছিলাম।

আমরা যখন জানার মধ্যে থাকি, তখন ইন্টারভিউ নিতে কোনো সমস্যা হয় না। যাঁরা মাসের ৩০ দিনই কাজ করি, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকে না।
আপনি যখন নিয়মিত একটা কাজের মধ্যে ডুবে থাকবেন, পড়াশোনা করবেন, সংবাদপত্র পড়বেন, ওই অতিথির প্রোফাইলে গিয়ে দেখবেন তিনি নতুন কী কী করছেন—জানার আগ্রহ যখন আপনার বেড়ে যাবে, আপনি আপডেটেড থাকবেন। তখন আলাদাভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো দরকার হয় না।

আর আমি আমার বেলায় যেটা করি, আমি যখন ইন্টারভিউ নিতে যাই, সব সময় চেষ্টা করি যাঁদের ইন্টারভিউ নিই, প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ইন্টারভিউ আমার ডায়েরিতে লেখা থাকে। আমার কাছে এ রকম ২০–২৫টা ডায়েরি রয়েছে। সেখানে আমার ইন্টারভিউ নেওয়া বাংলাদেশের প্রায় সব সেলিব্রিটির জীবনের গল্প লেখা রয়েছে। নতুন কোনো তথ্য পেলে সেটাও যুক্ত করে ফেলি। এই কাজটাতে আমি আনন্দ পাই। আমার পাশে এই মুহূর্তেও কলম ও ডায়েরি রয়েছে।

একেকজনের অভ্যাস একেক রকম। কেউ হয়তো নোট করতে পছন্দ করেন না। কেউ ফোনের নোটবুকে লিখে রাখেন।
আমি যেটা করি, নিয়মিত আমার কাজগুলোকে গুছিয়ে নিই। একঘেয়েমি যে আমাকে পেয়ে বসে না, এমন না। তারপরও যেহেতু আমি আমার কাজটাকে ভালোবাসি, আমার মনে হয় যখন আমি মাইক্রোফোনটা হাতে নিই, তখন আমি আমার এনার্জিটা ফিরে পাই।

ব্যক্তি আমি আর উপস্থাপক আমি—এই দুজনের মধ্যে আসলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে, হোস্টের চেয়ারে আমি একজন পারফর্মার। আপনাকে ভালো পারফর্মার হতে হলে জানার আগ্রহ অনেক বাড়াতে হবে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নিজস্ব একটা সত্তা তৈরি করতে হবে—যে এটাই আমি। জানার কিন্তু কোনো শেষ নেই। প্রচুর জানতে হবে, প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। আর যেটা আপনি করতে চান, সেটার প্রতি খুবই প্যাশনেট হতে হবে। নয়তো আপনি সেটা অর্জন করতে পারবেন না।

শব্দ উচ্চারণ করতে গেলে গলায় মনে হয় কিছু একটা আটকে আছে। এটা দূর করার উপায় কী?
অনেকের কথা বলার স্টাইল একেক রকম। এটা ডিপেন্ড করে। অনেককে দেখবেন, নাকটাকে একটু বেঁধে বেঁধে কথা বলেন, মনে হয় যেন একটু ন্যাকামি করে কথা বলছেন। আবার কারও মনে হয়, গলার মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে কথা বলছেন। আমার কাছে মনে হয়, এটা চর্চার ব্যাপার।

যেমন আমি খুবই দ্রুত কথা বলি। আমার ধারণা, উপস্থাপকদের মধ্যে সবাই খুব দ্রুত কথা বলেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে আমরা যখন সকালের কোনো অনুষ্ঠান করছি, ভোরবেলার কোনো অনুষ্ঠান কিংবা আমার অতিথি হয়তো এমন কেউ, যিনি খুবই নামকরা বা প্রবীণ—সে ক্ষেত্রে আমরা অন্য সময় যেভাবে দ্রুত কথা বলি, সেভাবে বলি না।

হয়তো আমি একজন রাজনৈতিক নেতার ইন্টারভিউ করছি, সেখানে ভয়েস টোন এক রকম হবে। আবার আমি হয়তো একজন রকস্টারের ইন্টারভিউ করছি, সেখানে ভয়েস টোন একেবারেই আলাদা হবে।

একজন মানুষ যখন অনেক চর্চা করবেন, তখন তাঁর কথা বলার স্টাইল কী হবে, সেটা বুঝতে পারবেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভয়েস টোন পরিবর্তন করতে পারবেন।
আপনি যে টোনে কথা বলছেন, সেটা মানুষের ভালো লাগছে কি না, এটা বোঝার ক্যাপাবিলিটি থাকতে হবে।

কেন মানুষ আপনাকে দেখবে? যখন মানুষ আপনার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনবে।
আমার কাছে মনে হয় একজন উপস্থাপকের কাজ তিনটা—এক. টু ইনফর্ম; দুই. টু এডুকেট; তিন. টু এন্টারটেইন। এই তিনটা যদি সঠিকভাবে দিতে পারেন, তাহলে মানুষ আপনার কথা শুনবে।

আরও পড়ুন