একদিন সকালে আমি আর বন্ধু নাঈম হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, মোটরসাইকেল নিয়ে খুলনা থেকে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখতে যাব। কোনো বড় প্রস্তুতি ছিল না; শুধু ছিল নতুন কিছু দেখার আগ্রহ আর একটু ভ্রমণ।
সকালটা ছিল বেশ শান্ত। রাস্তায় হালকা কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস, আর সামনে লম্বা পথ। সব মিলিয়ে যাত্রাটা শুরুতেই অন্য রকম ভালো লাগা এনে দেয়। মোটরসাইকেলে করে আমরা খুলনা শহর ছেড়ে ধীরে ধীরে গ্রামের পথে ঢুকে পড়লাম। রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছপালা, মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম, আর মানুষের ব্যস্ত জীবন। পথটাও যেন এক আলাদা অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
কিছু সময় পর আমরা পৌঁছে গেলাম বাগেরহাটে, যেখানে ইতিহাস যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছর ধরে। ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। ১৫ শতকে খান জাহান আলী এই অঞ্চলকে ঘিরে একটি জনপদ গড়ে তুলেছিলেন। সে সময় এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তিনি সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে এখানে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল খলিফাতাবাদ।
মসজিদটি দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। লাল ইটের বিশাল কাঠামো, সারি সারি গম্বুজ, আর প্রাচীন স্থাপত্যের নিখুঁত নকশা। সবকিছু যেন এক অন্য যুগের গল্প বলে। ভেতরে ঢুকে ঠান্ডা পরিবেশ আর নীরবতা মনকে এক অদ্ভুত শান্তি দেয়। মনে হচ্ছিল, শত শত বছর আগে এখানেই মানুষ নামাজ পড়ত, প্রার্থনা করত, আর সেই ইতিহাস আজও দেয়ালের গায়ে লেগে আছে।
মসজিদের আশপাশে ঘুরতে গিয়ে আমরা জাদুঘরেও ঢুঁ মারলাম। সেখানে বিভিন্ন সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ১৫–১৬ শতকের রুপার মুদ্রার প্রতিরূপ, মাটির তৈরি বড় বড় পাত্র, আর নানা প্রাচীন সামগ্রী দেখে বোঝা যায় এই অঞ্চলের ইতিহাস কতটা সমৃদ্ধ ছিল। প্রতিটি জিনিস যেন সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রার গল্প বলে।
আরও একটি বিষয় আমাদের নজর কাড়ে। খান জাহান আলীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা কিংবদন্তি। বলা হয়, তিনি শুধু একজন শাসক বা স্থপতি ছিলেন না, বরং একজন সুফি সাধকও ছিলেন। তাঁর সময়ে এখানে অনেক পুকুর, রাস্তা আর মসজিদ তৈরি হয়েছিল। কাছেই রয়েছে একটি দিঘি, যেখানে কুমির থাকার গল্পও শোনা যায়, যেগুলো স্থানীয় মানুষের কাছে অনেকটা রহস্যময় ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
পুরো জায়গা ঘুরে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন সময়ের অনেকটা পেছনে চলে গেছি। চারপাশের শান্ত পরিবেশ, পুরোনো ইটের গন্ধ, আর ইতিহাসের ছোঁয়া—সব মিলিয়ে মনটা ভরে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম, শুধু সেই পরিবেশটাকে অনুভব করার জন্য।
দুপুরের দিকে আমরা খুলনার পথে রওনা দিলাম। ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, হঠাৎ করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটা কত সুন্দর একটা দিন উপহার দিল। খুব বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল না; কিন্তু এই ছোট্ট ভ্রমণ আমাদের মনে অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।