নীরবতার পাহাড় সেন্ট পল’স হিল

মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল, মালয়েশিয়াছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

কিছু জায়গা আছে, যেখানে গেলে শব্দ কমে আসে। পায়ের শব্দও যেন আস্তে হাঁটে। মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল তেমনই এক জায়গা। রাত নামলে এই পাহাড় কোনো পর্যটন স্পট থাকে না, এটা হয়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে একান্ত আলাপের জায়গা।

চারদিকে অন্ধকার। দূরে শহরের আলো জ্বলছে, কিন্তু এখানে এসে সে আলো থেমে গেছে। ছাদহীন একটি চার্চ, ভাঙা দেয়াল, আর সামনে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক মূর্তি সবকিছু যেন ইতিহাসের ভারে নীরব।

চার্চটি প্রায় পাঁচ শতক আগে, ১৫২১ সালে নির্মিত। পর্তুগিজ শাসনামলের প্রথম দিককার সাক্ষ্য। তখন মালাক্কা শুধু একটি বন্দর ছিল না, ছিল সাম্রাজ্যের স্বপ্ন। এই পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা চার্চটি ছিল সেই স্বপ্নের প্রার্থনাকক্ষ। যুদ্ধ জয়ের কৃতজ্ঞতা, সমুদ্রযাত্রার নিরাপত্তা, ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ সবকিছুর প্রতিধ্বনি ছিল এই দেয়ালের ভেতর।

মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল, মালয়েশিয়া
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

কিন্তু দেয়ালের গল্প এখানেই শেষ হয় না। ভেতরে ঢুকলে চোখ পড়ে মেঝের সঙ্গে মিশে থাকা পাথরের ফলকগুলোর দিকে। প্রথম দেখায় এগুলো ধ্বংসাবশেষের অংশ মনে হয়। একটু থামলে বোঝা যায় এগুলো কবর। চার্চের মেঝেই শুয়ে আছে ইতিহাসের শরীর।

এই কবরগুলো ১৬ ও ১৭ শতকের ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের। পর্তুগিজ শাসনামলের সেনাপতি, নৌ অফিসার, ধর্মযাজক ও ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের শেষ ঠিকানা ছিল এই চার্চ। জীবনে তারা এসেছিল ক্ষমতা, বিশ্বাস আর সাম্রাজ্যের ভার নিয়ে। মৃত্যুর পর সবকিছু গুটিয়ে গেছে কয়েক ইঞ্চি পাথরের নিচে।

কবরের ফলকগুলোর গায়ে খোদাই করা ল্যাটিন ও পর্তুগিজ অক্ষর আজ অনেকটাই ঝাপসা। কোথাও সাল দেখা যায়, কোথাও শুধু একটি ক্রস বা প্রতীক। অনেক নাম আর পড়া যায় না। সময় এখানে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেনি, ধীরে ধীরে মুছে দিয়েছে। পরিচয়ও একদিন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, এই কবরগুলো তার প্রমাণ।

আরও পড়ুন
মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল, মালয়েশিয়া
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

চার্চের সামনে যে মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে, তিনি সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার। ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে ধর্মপ্রচারক হিসেবে। কিন্তু এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে মনে হয় এক দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্ত পথিক। ভারত, জাপান, চীন, এশিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো মানুষটি মালাক্কাকে নিজের কাজের কেন্দ্র বানিয়েছিলেন।

১৫৫২ সালে চীনে যাওয়ার পথে সেন্ট ফ্রান্সিসের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ আনা হয়েছিল এই চার্চে। কিছুদিনের জন্য এখানেই রাখা ছিল নিথর শরীর। খ্রিষ্ট বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই দেহ নাকি পচেনি, এক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দেয় ইতিহাসে। সে বিশ্বাসই আজও এই পাহাড়কে পবিত্র করে রেখেছে।

কিন্তু ইতিহাস কেবল বিশ্বাসে থেমে থাকে না। ১৬৪১ সালে ডাচরা মালাক্কা দখল করলে ক্ষমতার ভাষা বদলে যায়। নতুন শাসকেরা পাহাড়ের নিচে নতুন চার্চ বানান আর এই চার্চকে ছেড়ে দেন সময়ের হাতে। ছাদ খুলে নেওয়া হয়, দেয়াল ক্ষয়ে যেতে থাকে। প্রার্থনার জায়গা রূপ নেয় ধ্বংসাবশেষে।

মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল, মালয়েশিয়া
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা
মালাক্কার সেন্ট পল’স হিল, মালয়েশিয়া
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

রাতে চার্চের ভেতরে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, এ জায়গা থেকে ঈশ্বরের অনুপস্থিতি নয়, মানুষের অনুপস্থিতিই স্পষ্ট। ইতিহাস এখানে থেকে গেছে আর ভাঙা সমাধিফলকগুলো শব্দহীন কণ্ঠে সাক্ষ্য দেয় পৃথিবীর সব সাম্রাজ্যই ক্ষণস্থায়ী।

সেন্ট পল’স হিল আসলে দেখার জায়গা নয়, বোঝার জায়গা। যারা শুধু ছবি তুলতে আসে, তাদের কাছে এটা পাঁচ মিনিটের গল্প। কিন্তু যারা থামে, যারা ইতিহাস জানে, তাদের কাছে এই পাহাড় প্রশ্ন তোলে ক্ষমতা কী, বিশ্বাস কী আর সময়ের কাছে মানুষ কতটা ক্ষুদ্র।

মালাক্কার কোলাহল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড় মনে করিয়ে দেয় সব শহরের হৃদয় থাকে না আলোতে। কিছু হৃদয় থাকে ধ্বংসের মধ্যে, নীরবতার ভেতর। সেন্ট পল’স হিল তেমনই এক হৃদয়। চুপচাপ। ভারী। অথচ গভীরভাবে জীবিত।

দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা