পঞ্জিকার ৫০০ বছর ও বৈশাখ

বাংলা নববর্ষ বরণছবি: সাইফুল ইসলাম
ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৫০০ বছর আগের ভারতবর্ষে। ১৫২৬ সালের এক তপ্ত দুপুরে।

বাংলার ঋতুচক্র আর মাটির ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে আছে এক প্রাচীন উৎসবের উপাখ্যান। অনেককাল আগের কথা। বাংলার আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখে কৃষক বুঝতেন লাঙল নামানোর সময় হয়েছে। কিন্তু তখন আজকের দিনের মতো সময়ের নাম ছিল না। ছিল না তেমন কোনো সনের হিসাব। মরুভূমি থেকে আসা হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে তখন দিন চলত। সেই হিজরি ছিল চাঁদের হিসেবে গড়া এক মায়াবী ক্যালেন্ডার। প্রতিবছরই এটি ১১ দিন করে পিছিয়ে যেত। কিন্তু বাংলার মাটি তো চলে সূর্যের নিয়মে। ঋতুর ছন্দে। ফলে খাজনা আদায়ের সময় নিয়ে সমস্য হলো। এ জন্য ফসল কাটার আগেই রাজকীয় খাজনার ডাক আসত। তখন কৃষকেরা চারদিক অন্ধকার দেখতেন। এই বিষম সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই জন্ম নিল এক নতুন বর্ষপঞ্জি, যা আজ আমাদের প্রাণের বাংলা সন।

ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৫০০ বছর আগের ভারতবর্ষে। ১৫২৬ সালের এক তপ্ত দুপুরে। পানিপথের প্রান্তরে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। মোগল সম্রাট বাবর তাঁর দূরদর্শী রণকৌশলে পরাজিত করলেন ইব্রাহিম লোদিকে। তখন এক বিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন হলো। এর শিকড় ছড়িয়ে পড়ল দক্ষিণ এশিয়ার আনাচকানাচে। বাবর ছিলেন ফারসি সংস্কৃতির অনুরাগী এক যোদ্ধা। মঙ্গোল রক্ত তাঁর ধমনিতে বইত বলেই তাঁরা হলেন মোগল। তাঁরই উত্তরসূরিদের হাত ধরে ভারতবর্ষ দেখল এক স্বর্ণযুগ। বাবর থেকে হুমায়ুন, তারপর এলেন মোগলদের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবর।

আকবরের শাসনকাল ছিল যেন এক মহামিলনের কাব্য। তিনি দেখলেন, হিজরি সনের হিসাবে কৃষকদের ওপর বড় অবিচার হচ্ছে। ফসল ঘরে ওঠার আগেই খাজনার তাগাদা কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। সম্রাট ভাবলেন এমন এক সনের কথা, যা হবে মাটির সঙ্গে মানানসই।

তখন ১৫৮৪ সাল। বসন্তের বাতাস বইছে আগ্রার প্রাসাদে। সম্রাট আকবর তাঁর রাজদরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ খান সিরাজিকে ডেকে পাঠালেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী ব্যক্তি। সম্রাট তাঁকে আদেশ দিলেন চন্দ্র ও সৌরবর্ষের মধ্যে এক অপূর্ব সেতু তৈরি করতে। ফতেহউল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করলেন ‘ফসলি সন’। এই নতুন দিনপঞ্জির সূচনা ধরা হলো সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ সাল থেকে।

মূলত সেই ফসল কাটার মৌসুমকে কেন্দ্র করেই বাংলা সনের চাকা ঘুরতে শুরু করল। এভাবেই রাজকীয় আজ্ঞায় জন্ম নিল বাঙালির নিজস্ব কালপঞ্জি। যদিও ইতিহাসের কোনো কোনো বাঁকে মুর্শিদ কুলি খানের নামও জড়িয়ে আছে। তবে আকবরের অবদানের কথাই সবাই জানে। বাংলার এই নতুন দিনপঞ্জি হয়ে উঠল উৎসবের উৎস।

চৈত্রসংক্রান্তির বিদায়বেলায় যখন নতুন সূর্য উঁকি দিত তখন শুরু হতো শুভ হালখাতা। জমিদার ও মহাজনেরা মিষ্টিমুখ করাতেন প্রজাদের। পুরোনো দেনা চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার সেই রীতি আজও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বৈশাখের সেই প্রথম ভোরে বাংলার ঘরে ঘরে মিলনের সুর বেজে উঠত। ধীরে ধীরে এই রাজকীয় ফরমান রূপ নিল এক বিশাল সামাজিক উৎসবে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ল বৈশাখী মেলার আনন্দধ্বনি।

আরও পড়ুন

কৃষকের লাঙল আর বণিকের খাতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মাসের নামগুলোর পেছনের গল্পও বেশ রোমাঞ্চকর। শুরুতে ফারসি ভাষায় নামগুলো রাখা হয়েছিল কারবাদিন বা বিসুয়ার মতো দুরূহ সব শব্দে। কিন্তু বাংলার মাটি ও মানুষের মুখে সেই নামগুলো টেকেনি। নক্ষত্রের নাম ধরে ডাকতে শুরু করল সাধারণ মানুষ। বিশাখা নক্ষত্র থেকে এল বৈশাখ, জায়িস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ। এভাবেই আষাঢ়ী নক্ষত্র থেকে আষাঢ় আর শ্রাবণী থেকে নাম হলো শ্রাবণ। ভাদ্রপদ থেকে এল ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন। নক্ষত্রপুঞ্জের এই মেলা চলল ১২টি মাসজুড়ে। কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ, পৌষ থেকে মাঘ—সবই যেন আকাশের তারাদের দান। ফাল্গুনী নক্ষত্র থেকে ফাল্গুন আর চিত্রা থেকে চৈত্র হয়ে মাসগুলো পূর্ণতা পেল। বাংলার প্রকৃতি এই নামগুলোকে আপন করে নিল পরম মমতায়।

কালের বিবর্তনে আধুনিক যুগের বাংলা সনে কিছু পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। ১৯৬৬ সালে ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হলো এক বিশেষ কমিটি। তাঁরা চাইলেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দিনক্ষণ সাজাতে। সিদ্ধান্ত হলো বছরের প্রথম পাঁচ মাস হবে ৩১ দিনে। বাকি সাত মাস হবে ৩০ দিন। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এই সংস্কারকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। সেই থেকে আমাদের ক্যালেন্ডারে ১৪ এপ্রিল হলো পয়লা বৈশাখ। আজ যখন আমরা নতুন সাজে উৎসবে মাতি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত এই সনের দীর্ঘ যাত্রাপথ। এই সন কেবল সংখ্যা নয়, এটি আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস। এটি আমাদের কৃষকের ঘাম আর সম্রাটের দূরদর্শিতার এক অনন্য ফসল। বাংলা সন আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেঁচে আছে চিরকাল।

কবি, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক