বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য, উৎসব ও বর্ষবরণ

এবার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। রমনার বটমূল ঢাকা, ১৪ এপ্রিল ২০২৬,ছবি: দীপু মালাকার

আকাশে আগুনের হলকা। তপ্ত রোদে পুড়ছে চরাচর। আবার পরক্ষণেই মেঘের লুকোচুরি। বৈশাখ মানেই এই বৈপরীত্য। একদিকে তীব্র দহন, অন্যদিকে কালবৈশাখীর শীতল পরশ। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র এই সময়কে বলেছিলেন ‘সুখের সময়’। আবার রবীন্দ্রনাথের চোখে এটি ছিল এক রহস্যময়ী রূপ। তাঁর গানেই তো কালবৈশাখী এসে সন্ধ্যার আকাশ ঢেকে দেয়। কাজী নজরুলের কলমে বৈশাখ আসে ভাঙাগড়ার খেলা নিয়ে। বৈশাখ মানেই নতুনের আবাহন।

ভোর হয় গানের সুরে। রমনায় ছায়ানট নববর্ষকে স্বাগত জানায়। আমরা বলি ‘বটমূল’। কিন্তু যে ছায়ায় সুর ঝরে, সেটি অশ্বত্থগাছ। ছায়া কিন্তু বটগাছের মতোই গভীর। সেই অশ্বত্থের নিচেই প্রাণ ফিরে পায় নাগরিক বাঙালি। শহর, বন্দর আর গ্রাম সবই একাকার হয়ে যায় ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে। ছোট শিশুদের পরনে রঙিন পোশাক। নারীদের খোঁপায় রঙিন ফুল। দেশটা যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস হয়ে ওঠে।

বৈশাখ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়। এটি আমাদের জাতিসত্তার মূল শিকড়। চৈত্রসংক্রান্তি দিয়ে এর শুরু। বছরের শেষ দিনটিতে নিরামিষ আহার আর ধোয়া-মোছার ধুম পড়ে। পরদিন পয়লা বৈশাখ। খুব ভোরে ওঠা। নতুন জামা পরা। আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া। কুটিরশিল্পের মেলা। পিঠা-পুলির ঘ্রাণ। আর অবশ্যই পান্তা-ইলিশের সেই চিরচেনা স্বাদ। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের রেশ। এটিই আমাদের সর্বজনীন লোকজ উৎসব।

আশির দশকের শেষে শুরু হয়েছিল এক নতুন যাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেসকো একে দিয়েছে অমূল্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। প্রতিবছর নতুন থিম। নতুন নতুন লোকজ মোটিফ। রঙিন মুখোশ আর পুতুলের ভিড়ে আমাদের ইতিহাস কথা বলে ওঠে। তরুণ-তরুণীদের পদভারে কম্পিত হয় রাজপথ। এটি কেবল মিছিল নয়, এটি অশুভকে দূর করার এক শপথ।

বিজু উৎসবে ঝুড়িতে থাকা ফুল ভাসানো হচ্ছে কলাপাতায়। সাঙ্গু নদের তীরে, বান্দরবান, ১২ এপ্রিল
ছবি: মং হাই সিং মারমা

পাহাড়েও লাগে বৈশাখের হাওয়া। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা একে বরণ করে নিজের মতো করে। চাকমাদের কাছে এটি ‘বিজু’। মারমাদের কাছে ‘সাংগ্রাই’। ত্রিপুরারা বলে ‘বিসু’। নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু আনন্দের উৎস এক। তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ আর গানে পাহাড়গুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। সমতল আর পাহাড় মিলেমিশে এক হয়ে যায় এক অদৃশ্য সুতায়।

সময় বয়ে গেছে। বদল এসেছে উৎসবে। আগে মানুষের হাতে অবসর ছিল। রাতে পালাগান হতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল সংগ্রহ করা হতো। চলত বড় ভোজ। আজ সেই যৌথ আনন্দ কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। আধুনিক জীবন আর করপোরেট বাণিজ্য আমাদের সহজ আনন্দগুলো কেড়ে নিচ্ছে। শত শত কোটি টাকার ব্যবসায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণের মেলা। তবু আমরা লড়াই করি।

বৈশাখ ঘিরে জনপদজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, হাডুডু খেলাসহ নানা অনুষ্ঠান। এক দিন, দুই দিন—কোথায় কোথায় সপ্তাহ ধরে মেলা বসে। এসব মেলায় দা, বঁটি, খুন্তি, কোদাল, কাস্তে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, ধামা, কুলা, চালুনি ইত্যাদি পাওয়া যায়। আবার হাতপাখা, পুতুল, বাঁশি, বেলুন, ঢোল, ডুগডুগি, ফিতা, পুঁতির মালা, কাচের চুড়ি, ইমিটেশনের গয়নাসহ নানা শখের পণ্য মেলায় পাওয়া যায়।

বৈশাখে পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ও গানের আসর বসে। বাউলগান, লোকগান, মারেফতি, ভাটিয়ালিসহ নানা ধরনের গান বাঙালির বৈশাখকে আনন্দমুখর করে তোলে। আবার তালপাতার বাঁশির সুরে অনেকে ফিরে যায় কল্পনার শৈশবে। গ্রামের অবহেলায় পড়ে থাকা মাঠে যেমন বৈশাখী মেলা হয়, তেমনি শহরের অভিজাত এলাকার ভবনে-রেস্টুরেন্টে মেলা হয়।

আমাদের ঐতিহ্যের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। সাতচল্লিশের দেশভাগ কিংবা ভাষার ওপর আক্রমণ—আমরা হার মানিনি। সোনা ব্যবসায়ীদের হালখাতা থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব আজ বাঙালির প্রাণ। সংস্কৃতিই আমাদের আসল পরিচয়। হাজার বছর ধরে এটি আমাদের ভেতরে বহমান। পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। কিন্তু বৈশাখের সেই আদি ও অকৃত্রিম টান আজও অমলিন। আসুন, যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে এই প্রাণের উৎসবকে আগলে রাখি। বৈশাখ মানেই তো নতুন করে বাঁচা। বৈশাখ মানেই তো আবার শুরু করার সাহস।

কবি, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক