ফিদেল কাস্ত্রো ও আজকের পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকতা
ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন কিউবার একজন বিপ্লবী নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় পাঁচ দশক দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরু আইন বিভাগের একজন ছাত্র হিসেবে হলেও, ইতিহাসে তিনি পরিচিত হয়েছেন গেরিলা যোদ্ধা, বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে।
একটি ছোট দ্বীপদেশ হয়েও কিউবাকে তিনি বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে ফিদেল কাস্ত্রো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অনেকে তাঁকে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা নেতা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রোর ভূমিকা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি ছিল সমাজতন্ত্র ও মার্ক্সবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও বাসস্থান যেন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়, এই লক্ষ্যেই তিনি কিউবার রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন। পুঁজিবাদকে তিনি সামাজিক বৈষম্যের প্রধান কারণ হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান বাড়ায়। এই বিশ্বাস থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরোধিতা করেন এবং কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
কাস্ত্রোর শাসনের একটি সমালোচিত দিকও ছিল। রাজনৈতিক বিরোধিতা, ভিন্নমত এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। কাস্ত্রোর ধারণা ছিল, বিপ্লবের অর্জন রক্ষা করতে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এখানেই তাঁর আদর্শ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ফিদেল কাস্ত্রোর ভাবনা এখনো প্রাসঙ্গিক। একদিকে তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন সামাজিক ন্যায্যতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বের কথা; অন্যদিকে তাঁর শাসনব্যবস্থা দেখায়, ক্ষমতা যদি জবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তাহলে ভালো উদ্দেশ্যও সমস্যার কারণ হতে পারে। ফিদেল কাস্ত্রো প্রয়াত হলেও তাঁর ভাবনা আজও আলোচনায় থাকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে। তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছিলেন তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র কি কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য, নাকি সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কি মৌলিক অধিকার, নাকি কেবল আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়?
বাংলাদেশে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির আলোচনা চললেও বাস্তবতায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো স্পষ্ট বৈষম্য দেখা যায়। ভালো চিকিৎসা ও মানসম্মত শিক্ষা অনেক সময় ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে কিউবার অভিজ্ঞতা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও কীভাবে সামাজিক খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব।
তবে কাস্ত্রোকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার আগে তাঁর শাসনের সীমাবদ্ধতাগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায্যতা ও মানবাধিকার একসঙ্গে রক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ সমাজের জন্য ফিদেল কাস্ত্রো একটি চিন্তার জায়গা তৈরি করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব এবং জাতীয় স্বার্থে বড় শক্তির বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া যায়। একই সঙ্গে তাঁর শাসন আমাদের সতর্ক করে দেয়, রাজনৈতিক সাহসের সঙ্গে জবাবদিহি না থাকলে তা স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হতে পারে। এই কারণেই ফিদেল কাস্ত্রোকে কেবল নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে নয়, বরং একটি শিক্ষণীয় ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে দেখা যায়। তাঁকে বোঝা মানে রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং মানুষের অধিকারের বিষয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করা। সেখান থেকেই একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে ওঠার আলোচনা শুরু হয়।
বন্ধু, ক্যামব্রিয়ান বন্ধুসভা