তখন প্রাইমারিতে পড়াশোনা করি। শারীরিক শিক্ষার একটা অংশ হিসেবে হাতে তৈরি শিল্পকর্ম জমা দিতে হতো ফাইনাল পরীক্ষার আগে।
এর আগে সাধারণত কাগজ বা মাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্ম জমা দিয়েছিলাম। সেবার একটু ভিন্ন ধরনের কিছু জমা দেওয়ার ব্যাপারে ভেবেছি। হাতে সময় মাত্র দুই দিন। বিষয়টা আম্মুকে জানালাম। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। রাতের খাবারের পর বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখি।’
আম্মুর কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। তিনি যেহেতু বলেছেন, সেহেতু ভিন্নধর্মী কিছু একটা নিশ্চয়ই হবে।
যথারীতি নৈশভোজ সম্পন্ন করলাম। আম্মু ডেকে বললেন, ‘যাও তো, রান্নাঘর থেকে অবশিষ্ট তিন-চারটা ম্যাচ বক্স, সেলাই মেশিনের অবশিষ্ট টুকরা কাপড়, কেচি আর আইকাগাম নিয়ে আসো।’
সেগুলো নিয়ে হাজির হলাম। আম্মু আমার হাতে টুকরা কাপড়গুলো দিয়ে বললেন, ‘কাপড়গুলো স্কয়ার সাইজে সুন্দর করে কেটে দাও তো।’
আমি কাঁচি দিয়ে কাপড়গুলো কাটলাম আর আম্মু ম্যাচ বক্স দিয়ে কী করতে যাচ্ছেন, সেটার দিকেও নজর দিলাম।
আম্মু দুইটা ম্যাচ বক্সকে আইকা গাম দিয়ে জোড়া দিলেন। কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমরা ম্যাচ বক্স দিয়ে কী করতে যাচ্ছি?’ তিনি হেসে বললেন, ‘আগে যদি বলে দিই ,তাহলে কাজের আনন্দ থাকবে না। আমি যা করি, তুমি দেখো আর একটু হাত লাগাও। করতে করতে তুমি বুঝে যাবে, এখানে কী হচ্ছে।’
ম্যাচ বক্স দুইটা জোড়া দেওয়া হলে ওটার ওপর সমান করে একটা নাইলনের টুকরা কাপড় আঠা দিয়ে এঁটে দেওয়া হলো।
বাকি চারটা ম্যাচ বক্স ছিল। আম্মু একটা ম্যাচ বক্স কাত করে তার ওপর মখমলের কাপড় আঠা দিয়ে এঁটে দিলেন, তারপর লম্বালম্বি আরেকটা ম্যাচ বক্স আঠা দিয়ে জোড়া দিলেন। সেই ম্যাচ বক্সের ওপরও একটা মখমলের টুকরা কাপড় এঁটে দিলেন। সেটা দেখে আমিও পরের দুইটা ম্যাচ বক্স জোড়া দিয়ে রঙিন টুকরা কাপড় এঁটে দিলাম।
ম্যাচ বক্সের পেছনে যে অংশে কাপড় দেওয়া হয়নি সেই অংশ লাল কাপড়ে মুড়িয়ে দেওয়া হলো। এখন পুরো শিল্পকর্মটা একটা সম্পূর্ণ লুকে প্রকাশ পেতে চলেছে। ম্যাচ বক্স দিয়ে তৈরি সোফাসেট। এখনো আরেকটা কাজ বাকি।
আম্মু বললেন, ‘জিনিসটা দেখতে সুন্দর লাগছে। তবে আরও সুন্দর লাগবে যদি এটা কোনো রঙিন বক্স দিয়ে আবৃত করা যায়। যাও, রান্নাঘরে একটা মিষ্টির বক্স পড়ে আছে আর খাটের নিচে র্যাপিং পেপার আছে, একটু নিয়ে আসো।’
আমি মিষ্টির বক্স আর র্যাপিং পেপার নিয়ে এলাম। আম্মু মিষ্টির বক্সটা পরিষ্কার করলেন। আঠার সাহায্যে র্যাপিং পেপার দিয়ে মিষ্টির বক্সকে আবৃত করলেন। তারপর মিষ্টির বক্সের ভেতর রঙিন জরির কাপড় আঠা দিয়ে এঁটে দিলেন আর ম্যাচ বক্সের সোফাসেটগুলো সুন্দর করে সেট করে দিলেন। দেখতে সত্যিই দারুণ লাগছিল।
আমরা শিল্পকর্ম তৈরিতে এতটাই মগ্ন ছিলাম যে কখন রাত দেড়টা বেজে গেল, টেরই পেলাম না। মনে একটা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে চলে গেলাম।
দুই দিন মনে বড় আশা নিয়ে সেই ম্যাচ বক্সের সোফাসেট শিল্পকর্ম জমা দিই। স্যার-ম্যাডাম আমার শিল্পকর্ম দেখে প্রশংসা করেছিলেন।
৩৭ আকুয়া জুবিলী কোয়ার্টার, ময়মনসিংহ