‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই…’
কবি মহাদেব সাহার এই আকুলতা কেবল কোনো ব্যক্তির একার ছিল না। একসময় এই ব্যাকুলতা ছিল কোটি মানুষের হৃদয়ের ধ্বনি। লাল রঙের ডাকবাক্স, হলুদ খাম কিংবা চিরকুটের ভাঙা-গড়া বাক্যে জমে থাকা সেই ভালোবাসার দিনগুলো আজ ধূসর অতীত। তবে যোগাযোগপ্রযুক্তির অবাধ জোয়ারে আজকের স্মার্ট প্রজন্ম যখন টুংটাং মেসেজ বা ইমোজির ভাষায় অভ্যস্ত, ঠিক তখনো চিঠির মাহাত্ম্য আর নস্টালজিয়া রয়ে গেছে আগের মতোই অবিকল। আগের মতোই প্রাণবন্ত।
চিঠি কেবলই যোগাযোগের মাধ্যম নয়। চিঠি মানুষের একান্ত অনুভূতির দলিল। স্মৃতির নকশিকাঁথা আর শিল্পীর ভালোবাসা প্রকাশের সাদা ক্যানভাস। যেখানে শিল্পী কালির অক্ষরে শৈল্পিক ভাবনায় এঁকে যান সময়ের কথা।
ফরাসি তাত্ত্বিক জাঁক দেরিদা বলেছিলেন, যেকোনো বয়ান অর্থবহ হয় স্মৃতি ও পারস্পরিক পার্থক্যের মিথস্ক্রিয়ায়। দেরিদার দর্শন অনুযায়ী, কেবল উপস্থিত বিষয়ই সত্য নয়, অনুপস্থিতির ভেতরেও লুকিয়ে থাকে গভীর অর্থ। চিঠি ঠিক এই অনুপস্থিতির জায়গাটাকেই পূর্ণ করত। একটি চিঠি কেবল কিছু শব্দের সংকলন নয়; তা প্রেরকের জীবনবোধ, সময় আর অস্তিত্বের নীরব বাহক। বছরের পর বছর ড্রয়ারে জমিয়ে রাখা একটি হলুদ খাম বহু বছর পরও হাসিকান্নার সেই পুরোনো দিনগুলোকে একদম জীবন্ত করে তুলে আনতে পারে।
আজ মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের দ্রুতগতির সংযোগে আমরা মুহূর্তেই একে অপরের খোঁজ পাচ্ছি ঠিকই, তবে হারিয়ে ফেলছি স্বকীয়তা ও আবেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমে বন্দী হয়ে আমাদের পোশাক, খাবার, সাজগোজ, এমনকি অনুভূতিগুলোও এখন একই ছাঁচে ঢালা। অতীতহীন এই বর্তমানে আমরা যেন একেকজন নিখাদ উপভোক্তা হয়ে উঠছি; কিন্তু এক টুকরা চিঠির শূন্যতা কি সত্যিই পূরণ করতে পারছে এই ইমোজি আর লাইক-কমেন্ট?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাম্রাজ্যের পতন, বিপ্লবের ডাক কিংবা গভীর প্রেম—সবকিছুর পেছনেই নীরব অনুঘটক হয়ে থেকেছে চিঠি।
যুদ্ধের ময়দানে রক্তের গন্ধের মধ্যেও নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী জোসেফিনকে লিখেছিলেন ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দরতম বয়ান। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও সুরসম্রাট বেটোফেন তাঁর অপ্রাপ্তির বিরহ উগরে দিয়েছিলেন প্রেয়সীকে লেখা চিঠিতে। কিংবা রুশ কথাসাহিত্যিক লিও তলস্তয় যখন তাঁর ভালোবাসাকে ‘সাধনা’ বলে আখ্যা দিয়ে চিঠি লেখেন, তখন ভালোবাসার পরিধি পৌঁছে যায় অন্য উচ্চতায়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে শান্তি ও মানবতার বার্তা নিয়ে হিটলারকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘যে কর্ম মানুষকে কষ্ট দেয়, তা ধর্ম হতে পারে না।’
চিঠি যেমন প্রেম জাগিয়েছে, তেমনি ইতিহাসও বদলে দিয়েছে। ১৯৬৫ সালে ফিদেল কাস্ত্রো যখন কিউবার জনসভায় চে গুয়েভারার শেষ চিঠিটি পাঠ করেন, তা হয়ে ওঠে বিশ্বরাজনীতি ও বিপ্লবের ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। জীবনের পদ-পদবি, নাগরিকত্ব ছেড়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়ার আগে কাস্ত্রোকে লেখা চের সেই চিঠি কেবল এক সহযোদ্ধার কাছে লেখা বয়ান ছিল না, ছিল এক বৈপ্লবিক দর্শনের দলিল।
আবার চিঠি কখনো কখনো ছড়াত অনাবিল স্বস্তি ও আতিথেয়তার উষ্ণতা। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের কাছে স্কটল্যান্ডের ড্রপ স্কোনসের রেসিপি লিখে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ!
চিঠির সূচনা ঠিক কবে এবং কোথায় তা নির্দিষ্ট করে বলা যেহেতু কঠিন; সুতরাং বলাই যায়, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় ‘পিক্টোগ্রাম’ বা চিত্রলিপির মাধ্যমে প্রথম মনের ভাব আদান-প্রদান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাচীন মিসর, রোম, চীন ও ভারতে এটি যোগাযোগের মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৭ ও ১৮ শতকে চিঠি ছিল নিজের চিন্তাকে ঝালিয়ে নেওয়ার এবং সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
কংক্রিট ও পাথরের তৈরি খাঁচায় আজ আমরা স্বেচ্ছায় বন্দী। চার দেয়ালের এই যান্ত্রিক ব্যস্ততা আমাদের এমন এক অমোঘ চক্রে পিষে রেখেছে, যেখানে বেঁচে থাকা আছে; কিন্তু জীবন যেন রূপ নিয়েছে স্রেফ অভ্যাসে।
কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙা চোখে ভিড়ঠাসা অফিস বাসে ঝুলতে থাকা আর দিন শেষে ক্লান্তি শরীরে মেখে ঘরে ফেরা—এই তো আমাদের চেনা দিনলিপি। খাতা-কলমের হিসাব কিংবা কম্পিউটারের কি–বোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে আমরা ভুলেই গেছি, আমাদেরও একটু নিজের মতো বেঁচে থাকার অধিকার ছিল! কিন্তু ভাবুন তো একবার—সবুজের ছোঁয়াহীন সেই ধূসর ক্যানভাসে যদি একচিলতে রোদ এসে পড়ে আপনার বারান্দায়, চিরচেনা ছন্দে; অফিসে যাওয়ার তাড়াহুড়ার মুহূর্তে প্রিয় মানুষটি যদি খুব গোপনে আপনার পকেটে গুঁজে দেয় একটা ভাঁজ করা রঙিন চিরকুট আর কানে কানে ফিসফিস করে বলে যায়—‘খুব গোপনে পোড়ো কিন্তু, শুধু তোমার জন্য…!’
ব্যস, মুহূর্তেই উবে যাবে সব ক্লান্তি। কংক্রিটের কড়া রোদ যেন নিমেষেই ঝরে পড়বে একপশলা শ্রাবণধারায়।
সময় বদলেছে, চিঠির যুগ হয়তো শেষ হয়েছে; কিন্তু চিঠির সেই অনির্বচনীয় অনুভূতি আজও চিরকাল অমলিন। প্রযুক্তির বিরামহীন মেসেজিংয়ের যুগেও একটি চিঠি কিংবা চিরকুট আজও পারে স্থবির জীবনে অমিয় বাতাসের প্রশান্তির দোলা দিতে।