আজ ৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। সারা বিশ্বের মোট ১২৯টি দেশে একযোগে এই দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি’।
অসংক্রামক রোগ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ফিজিওথেরাপির চার বছরব্যাপী প্রচারাভিযানের প্রথম ধাপ এটা। পরবর্তী বছরগুলোতে যথাক্রমে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও সিওপিডি নিয়ে কাজ করা হবে।
বিশ্ব ফিজিওথেরাপির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধানতম কারণ। প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ এই রোগে মারা যান, যা মোট বৈশ্বিক মৃত্যুর ৩০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘটছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যার মধ্যে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই প্রতিপাদ্য শুধু উন্নত বিশ্ব নয়, বরং এটি আমাদের দেশের জন্যও একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টরা উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ এবং তাঁদের শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র ৫ দিন ৩০ মিনিট করে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ব্যায়াম স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে।
এ ছাড়া যাঁরা ইতিমধ্যে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য ফিজিওথেরাপিস্টরা কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন; যা ভবিষ্যতে হৃদ্রোগজনিত জটিলতা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
তৃতীয়ত, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে স্ট্রোক-পরবর্তী রোগীদের জন্য এক্সারসাইজ-ভিত্তিক ফিজিওথেরাপি হাসপাতালে ভর্তির সময় থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটি পুনর্বাসন পর্যন্ত শারীরিক কার্যক্ষমতা, চলাফেরার সক্ষমতা, ভারসাম্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। স্ট্রোকের পর একজন রোগীর জন্য চেয়ার থেকে ওঠা, ঘরের ভেতর হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা বা দৈনন্দিন কাজে ফিরে যাওয়া ইত্যাদি কাজগুলোই আসলে দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার লক্ষ্য, যেখানে শারীরিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রোগীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা যেমন খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের প্যাটার্ন ইত্যাদি হৃদ্রোগ-স্ট্রোকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার অন্যতম কারণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফিজিওথেরাপি সেবার প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। হাসপাতাল, এনজিও এবং প্রাইভেট ক্লিনিক পর্যায়ে ন্যূনতম গ্র্যাজুয়েশন ফিজিওথেরাপিস্টদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং তাঁদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া গেলে তা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং সাধারণ মানুষও উপকৃত হবে।
ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথা উপশমের চিকিৎসা নয়, বরং এটি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, জীবনরক্ষাকারী পুনর্বাসন এবং স্বাধীন জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদানকারী একটি বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতি।
লেখক: জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপি), সানসাইন ফিজিওথেরাপি সেন্টার, উত্তরা