পাহাড়, প্রার্থনা আর প্রকৃতির শক্তি মিলে পোখারার অনন্য সৌন্দর্য

পোখারা শহর থেকে অন্নপূর্ণা রেঞ্জ স্পষ্ট দেখা যায়ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

পোখারা কোনো তাড়াহুড়োর শহর নয়। এখানে সময় যেন নিজের গতিতে চলে। নেপালের এই শহরে এসে প্রথমেই বুঝেছি এখানে দেখার জায়গা কম, অনুভব করার জায়গা বেশি। ক্যামেরা হাতে নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তার আগে থেমে দাঁড়াতে হয়েছে বারবার।

পাহাড়, প্রার্থনা আর প্রকৃতির শক্তি—এই তিনের মিলনেই পোখারার চরিত্র গড়ে উঠেছে। বিন্দাবাসিনী মন্দির, বিশ্বশান্তি স্তূপ, ফেওয়া লেক, ডেভিলস জলপ্রপাত এবং অন্নপূর্ণা রেঞ্জ এই জায়গাগুলো ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাই পোখারাকে নতুন করে চিনিয়েছে।

পোখারা শহরের উত্তরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত পুমদিকোট শিবমূর্তি নেপালের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা। নেপাল সরকার ও স্থানীয় উদ্যোগে এই বিশাল শিবমূর্তির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় ২০২১ সালে। প্রায় ১০৮ ফুট উচ্চতার এই মূর্তি শিবের ধ্যানমগ্ন রূপকে ধারণ করে নির্মিত।

পুমদিকোট অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে একটি প্রাচীন দুর্গ ও কৌশলগত পাহাড়ি অবস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। শিবমূর্তির অবস্থান থেকে একদিকে যেমন পুরো পোখারা উপত্যকা দেখা যায়, অন্যদিকে স্পষ্ট দেখা মেলে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতি ও পর্যটনের এক অনন্য সমন্বয় তৈরি হয়েছে।

ডেভিলস জলপ্রপাত
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

পোখারার দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ে অবস্থিত বিশ্বশান্তি স্তূপ নির্মিত হয় ১৯৭৩ সালে। জাপানের বৌদ্ধ ভিক্ষু নিপ্পনজান মিয়োহোজি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এই স্তূপ নির্মাণ করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী শান্তি, অহিংসা ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

এই স্তূপ বৌদ্ধধর্মের শান্তি দর্শনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এর চারদিকে বুদ্ধের বিভিন্ন ভঙ্গিমার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে; যা জন্ম, জ্ঞানপ্রাপ্তি, উপদেশ ও মহাপরিনির্বাণের প্রতীক। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে ফেওয়া লেক, পোখারা শহর ও অন্নপূর্ণা রেঞ্জ একসঙ্গে দেখা যায়। বিশ্বশান্তি স্তূপ আজ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং নেপালের একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি পর্যটনকেন্দ্র।

ফেওয়া লেক পোখারা শহরের প্রাণকেন্দ্র। নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে এটি স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেওয়া লেক পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

লেকের মাঝখানে অবস্থিত তাল বারাহী মন্দির হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র স্থান। নৌকাযোগে সেখানে পৌঁছানো যায়, যা লেককে ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশেষ করে। স্পষ্ট আবহাওয়ায় অন্নপূর্ণা ও মাছাপুচ্ছে (ফিশটেইল) শৃঙ্গের প্রতিচ্ছবি লেকে দেখা যায়, যা পোখারার আত্মপরিচয়কে ফুটিয়ে তোলে। সকাল ও বিকেলের আলোতে লেকের রং বদলায় এবং প্রতিদিন নতুন অনুভূতি দেয়।

ফেওয়া লেক
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

ডেভিলস জলপ্রপাত, স্থানীয়ভাবে পরিচিত পাতালে ছাঙ্গো, পোখারার সবচেয়ে রহস্যময় প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর একটি। এই জলপ্রপাতের বিশেষত্ব হলো ওপর থেকে নেমে আসা নদীর পানি হঠাৎ করেই মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই দৃশ্য আরও ভয়ংকর ও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।

‘ডেভিলস’ নামটির পেছনে রয়েছে একটি লোককথা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক বিদেশি পর্যটক এখানে সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রবল স্রোতে তলিয়ে যান এবং আর ফিরে আসেননি। সেই ঘটনা থেকেই জায়গাটির ইংরেজি নামকরণ হয় ডেভিলস জলপ্রপাত। ভৌগোলিকভাবে এটি একটি ভূগর্ভস্থ গিরিখাত ও গুহাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যা নেপালের ভূপ্রকৃতির জটিলতা ও শক্তির সাক্ষ্য বহন করে।

পোখারার আকাশরেখাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্নপূর্ণা রেঞ্জ এই শহরের স্থায়ী সঙ্গী। ভোরে বরফঢাকা শিখরে আলো পড়লে পাহাড়গুলো সোনালি হয়ে ওঠে, আবার সন্ধ্যায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ছায়ার মধ্যে।

একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আমি আলো ও রেখা খুঁজি। কিন্তু অন্নপূর্ণা আমাকে শিখিয়েছে সব সৌন্দর্য ফ্রেমে ধরা পড়ে না। কিছু সৌন্দর্য কেবল সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে হয়।

আরও পড়ুন

পোখারা এমন একটি শহর, যেখানে ধর্ম, প্রকৃতি আর মানুষ একে অপরের বিপরীতে দাঁড়ায় না; বরং পাশাপাশি পথ চলে। বিন্দাবাসিনী মন্দিরের প্রার্থনা, বিশ্বশান্তি স্তূপের নীরবতা, ডেভিলস জলপ্রপাতের শক্তি আর অন্নপূর্ণা রেঞ্জের স্থির উপস্থিতি সব মিলিয়ে পোখারা আমাকে শিখিয়েছে ধীরে দেখতে, গভীরভাবে ভাবতে।

সেখান থেকে ছবি নিয়ে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি নিয়ে ফিরেছি একটি শহরের অনুভব; যা ক্যামেরার বাইরে গিয়েও দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

দয়াগঞ্জ, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা